ইয়াযিদের দুষ্কর্ম: কারবালার সীমানা পেরিয়ে

”حد ہی نہیں حسین تیرے انتقام کی-

لفظِ یزید گالی سے بھی بدتر بنا دیا“

-علامہ اقبال رحمہ اللہ

“হোসাইন (রা) আপনার মর্যাদার কোন সীমা নেই, ইয়াজিদ তার নামের শব্দটিতো গালির চেয়েও নিকৃষ্ট।” -আল্লামা ইকবাল (রহ.)।

 ইয়াজিদের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অনেকে একে কেবল কারবালার ঘটনার মাঝেই সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। আর এই সীমাবদ্ধতার আড়ালে অনেকেই ইয়াজিদকে কারবালার অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দেওয়ার অপচেষ্টা করে বলেন, “ইয়াজিদ তো কারবালার ময়দানে ছিল না; সে এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশও দেয়নি, বরং এসব ইবনে জিয়াদ ও শিমারের দোষ।” কিন্তু সত্য এর চেয়েও বেশি কুৎসিত। ইয়াজিদকে কারবালার বাইরে রেখেও যদি বিচার করা হয়, কারবালার দায় থেকে মুক্তি দিয়েও যদি তার কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করা হয়, তবুও ইয়াজিদ ইতিহাসের পাতায় একটি ঘৃণিত চরিত্র হয়েই থাকবে। ধরে নিলাম, কারবালার সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেইনি এবং ইতিহাসের পাতায় এর কোনো অস্তিত্বই নেই—তা সত্ত্বেও এর বাইরে গিয়ে বিচার করলে ইয়াজিদকে আমরা কীভাবে পাই? ৬৩ হিজরি: হাররার হৃদয়বিদারক ঘটনা। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি মদিনাবাসীর ক্ষতি করার ইচ্ছা করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে এমনভাবে আগুনে গলিয়ে ফেলবেন, যেভাবে সিসা গলে যায় অথবা পানিতে লবণ গলে যায়।” (ইমাম মুসলিম (রহ.) কর্তৃক ‘হজ’ অধ্যায়ের ‘মদিনার ফজিলত’ পরিচ্ছেদে বর্ণিত)

কারবালার সেই নির্মম জুলুমের পর মদিনাবাসী ইয়াজিদের বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) প্রত্যাহার করে নেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ইয়াজিদ ‘মুসলিম বিন উকবা’-কে সেনাপতি করে ২০ হাজার সৈন্যের একটি বিশাল বাহিনী মদিনার দিকে প্রেরণ করে। সে নির্দেশ দেয়,”মদিনাবাসীকে তিনবার আহ্বান করবে; যদি তারা সাড়া না দেয়, তবে তিন দিনের জন্য মদিনা তোমাদের জন্য হালাল (উন্মুক্ত) করে নেবে। সেখানে যা ইচ্ছা তা-ই করবে।”

এই নির্দেশ পেয়ে তার বাহিনী মদিনায় ধ্বংসযজ্ঞ- নারকীয় তাণ্ডব চালায়, টানা তিন দিন ধরে সীমাহীন অত্যাচার করে। হত্যাকাণ্ড, লুটপাট ও রাহাজানি থেকে শুরু করে এমন কোনো হীন কাজ নেই যা তারা করেনি। তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়ি এমনকি বহু সাহাবায়ে কেরামকেও তারা শহীদ করে। একটু চিন্তা করে দেখুন, যেখানে মদিনাবাসীর র মতো এত বড় শাস্তির ঘোষণা রয়েছে, সেখানে মদিনাবাসীর ওপর এমন ভয়াবহ অত্যাচার কোনো দৃষ্টিতে ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য হতে পারে?

শুধু তা-ই নয়, ইয়াজিদের ধৃষ্টতা এতক্ষতি করার সামান্য ইচ্ছা পোষণ করার কারণেই আল্লাহ তাআলা কর্তৃক আগুনে গলিয়ে ফেলাটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, এর পরপরই সে মক্কা মুকাররমার উদ্দেশ্যেও বাহিনী প্রেরণ করে। ৬৪ হিজরি: মক্কা মুকাররমায় আক্রমণ। মদিনা ধ্বংস করার পর ইয়াজিদ মক্কা অভিমুখেও অভিযান চালানোর নির্দেশ দেয়। প্রাচীন ইতিহাসের বাদশাহ আবরাহার পর পবিত্র কাবা শরীফের প্রতি এমন ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস ইয়াজিদ ব্যতিত দ্বিতীয় কেউ করেনি। ইবনে নুমাইরকে সেনাপতি বানিয়ে হাররার সেই বাহিনীকে মক্কায় অভিযানের নির্দেশ দেয়। তারা মক্কা মুকাররমা প্রায় ৬৪ দিন অবরোধ করে রাখে। পবিত্র কাবা শরিফে মিনজানিক (তৎকালীন পাথর ও অগ্নিগোলক নিক্ষেপক যন্ত্র) দ্বারা আক্রমণ চালায়, কাবার একপাশের দেয়াল ধসিয়ে দেয় এবং কাবার গিলাফে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই আক্রমণ চলাকালেই ইয়াজিদের আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদ আসলে উক্ত ঘৃণীত বাহিনী কাবা শরিফে হামলা বন্ধ করে পিছু হটে। এসব ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, কারবালার ঘটনায় ইয়াজিদকে দায়মুক্তি দেওয়া হলেও তার পাপাচার ও অত্যাচারের কোনো শেষ নেই। সে সব দিক থেকেই এক ঘৃণিত পাপিষ্ঠ। যে মদিনা শরিফে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়, সে কীভাবে উত্তম হতে পারে? যে আবরাহার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কাবা শরিফে মিনজানিক দ্বারা আঘাত হানে, সে কোন দৃষ্টিতে ভালো মানুষ হতে পারে? তাই ইয়াজিদ ইতিহাসে চিরকালই ঘৃণিত—তা হোক কারবালার জন্য, হাররার হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্য কিংবা পবিত্র কাবা শরিফে আক্রমণের জন্য।

 তথ্যসূত্র:

ক. তারিখে খুলাফা – ইমাম জালাল উদ্দিন সুয়ূতী রহ.

খ. ইয়াজিদকে নিন্দা করার বৈধতা ও বিরুদ্ধবাদীদের যুক্তি খন্ডন – ইমাম ইবনে জাওজী রহ – অনুবাদ: আব্দুল্লাহ যোবায়ের – ঐতিহ্য প্রকাশন।

গ. শামে কারবালা – মুফতি শফি উকারভী (রহ.) অনুবাদ: মুহাম্মদ আনিসুজ্জামান।

ঘ. আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া ৮ম খন্ড – ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) – ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

ঙ. সাওয়ানিহে কারবালা – সদরুল আফাজিল সৈয়দ মুফতি মুহাম্মদ নঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী (রহ.)- অনুবাদ: সৈয়দ মুহাম্মদ আবু নওশাদ নঈমী আশরাফী‌।

মোহাম্মদ নেওয়াজ সিদ্দিকী
+ posts

মোহাম্মদ নেওয়াজ সিদ্দিকী একজন লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক। বর্তমানে তিনি  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি সাহিত্য বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top