ইমাম আব্দুল কাদির জিলানী ও সাঈদ নুরসির আধ্যাত্মচর্চা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য, যিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে তাঁর প্রেমে ধন্য করেছেন। অসংখ্য দরুদ ও সালাম  আল্লাহর ভালোবাসায় ধন্য প্রথম সত্তা ও আল্লাহ প্রাপ্তির মাধ্যম রাসুল সা. এর প্রতি। উক্ত প্রবন্ধে দুই জন বিখ্যাত মনিষীর রুহানি সোহবাত নিয়ে আলোকপাত করা হবে যারা মানব সভ্যতার ইতিহাসে মানব গঠনে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন।

দুনিয়াদারিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে মানুষ আজকে আধ্যাত্মিকতা চর্চা আর আধ্যাত্মিক শিক্ষকের গুরুত্ব- উভয়ই বিস্মৃত হয়েছে। শায়খ আব্দুল কাদির জিলানি র. আধ্যাত্মিকতার জগতে একজন প্রবাদপুরুষ, প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। বদিউযযামান সাঈদ নুরসি র. তাঁরই প্রবর্তিত কাদিরিয়া এবং পারিবারিকভাবে নকশবন্দিয়া তরিকার অনুসারী ছিলেন। তাসাউফচর্চার গুরুত্ব বুঝতে এই তথ্যটি জানা ও বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমরা এ প্রবন্ধটিতে এসব বিষয়ই সংক্ষেপে আলোচনা করেছি। প্রবন্ধটি মোটাদাগে দুটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। প্রথম পরিচ্ছেদে আমি সাঈদ ও তাঁর অনবদ্য রচনা রাসাইল-ই-নুরের পরিচয়, বিষয়বস্তু এবং সাঈদের  আধ্যাত্মিক জীবন নিয়ে আলোচনা করেছি। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে আলোচনা করেছি সাঈদ নুরসির জীবন গঠনে ও তাঁর রচনায় ইমাম জিলানির প্রভাব নিয়ে।

প্রথম পরিচ্ছেদ

সাঈদ নুরসির পরিচয়

পূর্ব তুরস্কের বিতলিস প্রদেশের নুরস নামের ছোট্ট একটি গ্রামে ১৮৭৭ সালে এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন সাঈদ। তিনি তাঁর পিতা সুফী মির্জা আর মমতাময়ী মা নুরিয়ার চতুর্থ সন্তান। এই দম্পতি ধর্মানুরাগে সবার কাছে ছিলেন উজ্জল দৃষ্টান্ত। মাত্র নয় বছর বয়সেই সাঈদ ইয়াতিম হন। 

পরিবারেই সাঈদের শিক্ষাজীবনের শুরু। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমার প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি আমার ভাই আব্দুল্লাহর হাতে। তাঁর কাছে দুবছর পড়েছিলাম। এরপর শায়খ মুহাম্মদ জালালির হালাকায় অংশ নিয়ে নির্ধারিত সমস্ত পাঠ্যপুস্তক শেষ করি। সবশেষে ওয়ান শহরে বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদানের জন্য ১৫ বছর ধরে কর্মরত ছিলাম।

শিক্ষকতায় আত্ননিয়োগের পরেও সাঈদের ছিল লেখাপড়া ও গবেষনার প্রতি অদম্য আগ্রহ। অল্প সময়েই তিনি কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ, তাসাউফ, তর্কশাস্ত্র, দর্শন, কালাম, গণিত, ইতিহাস, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান এবং ভাষায় অসামান্য ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। সাঈদের ভাষায়,

‘আমি ওয়ান শহরে অবস্থান কালে ওখানকার মেয়র তাহের পাশা তাঁর মেহমান খানার ওপর তলায় আমার থাকার জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সে সময় আমি শরিয়তের বিভিন্ন বিষয়ে লেখা মৌলিক প্রায় ৯০টি কিতাব মুখস্ত করেছি। মুখস্ত করা কিতাবগুলো  প্রতিদিন ৩ ঘন্টা করে তিন মাসে রিভিশন শেষ করতাম। হে আমার ভাইয়েরা আমি আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করি  যিনি আমাকে ঐ কিতাবগুলো মুখস্থ ও রিভিশন করার তৈফিক দিয়েছেন, যা পবিত্র কুরআনের রহস্য ও হাকিকত অনুধাবনে সহায়ক হয়েছে। এরপর কুরআন অনুধাবনে আমি এমন এক স্তরে পৌছেছি যে, দেখলাম পবিত্র কুরআনের প্রতিটি আয়াত মহাবিশ্বের সব কিছুকে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করছে। তারপর এই কুরআন আমাকে অন্য সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছে।’

সাঈদ খুব অল্প সময়েই পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র এবং তুরস্কের তথা মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয়, শিক্ষাগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কট অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই ঈমান ও আত্মসংস্কারের মাধ্যমে সেগুলো সংশোধনে মনোনিবেশ করেছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯১১ সালে দামেষ্কের ঐতিহাসিক জামে উমাভির মিম্বার থেকে মুসলিম বিশ্বের উদ্দেশে শিক্ষা ও সংস্কার নিয়ে এক ভাষণ দেন। এটা “আল-খুতবাতুশ শামিয়্যাহ” নামে পরিচিত।

নুরসির সংস্কার জীবন সহজ ছিল না। আতার্তুক সরকার নুরসিকে ৪ বার নির্বাসনসহ ২০-২২ বার কারাবন্দি করেছিলো। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। দেখা গেল জেলখানার সব কয়েদী আর কারারক্ষী নুরসির শিক্ষায় ও কুরআনের দিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে যাচ্ছে।

তাঁকে বহুবার প্রহসনের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিষ প্রয়োগে হত্যাসহ তিনি যে কত ধরনর ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়েছেন, তার কোন হিসাব নেই।

এই মহান ব্যক্তিত্ব ২৩ই মার্চ, ১৯৬০ সালে উরফায় ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের ৫ মাস পর নুরসির লাশ আতার্তুক বাহিনী কবর থেকে উত্তোলন করে দূর্গম পাহাড়ে অজ্ঞাত স্থানে দাফন করে দেয়। হয়তো তাঁদের এই নৃশংসতা ইমাম নুরসির কারামত। কারণ তাঁর ছাত্রদেরকে তিনি ওসিয়ত করেছিলেন, তাকে যেন এমন স্থানে দাফন করা হয় যে দুই এক জন ছাড়া আর কেউ না চেনে, তার কবরের স্থানও যাতে প্রচার করা না হয়।

নুরসির জীবনকে চারটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে ভাগ করা যায়।

প্রথম ধাপ (১৮৭৭-১৯০৭): এ সময়ে নুরসি শিক্ষালাভের পর আবারও শিক্ষকতা, চিন্তার গঠন ও আধুনিক গবেষনায় আত্ননিয়োগ করেন। তিনি এসময় ঘোষণা দেন, আধুনিক গবেষণা পদ্ধতি বা রিসার্চ মেথোডলজি জানা কুরআনের রহস্য উম্মোচনে সহায়ক এবং যুগের চাহিদা।

দ্বিতীয় ধাপ (১৯০৭-১৯২৬): এ সময়টুকু নুরসি শিক্ষা, সংস্কার, সামাজ ও রাজনীতি নিয়ে কাটিয়েছেন। তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন সংঘ গঠন করেন।  তাছাড়া নুরসি পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। নুরসি ১৯১২ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেন। এই ধাপটিকে নুরসি নিজেকে “পুরাতন সাঈদ” বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তৃতীয় ধাপ (১৯২৬-১৯৪৯): এ সময়ে তুরস্কে  নাস্তিক্যবাদ ক্ষমতা দখল করে। নুরসি এর বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ও স্নায়ু যুদ্ধে লিপ্ত হন। কামাল আতার্তুক ইমাম নুরসিকে বশ করতে না পেরে নির্বাসন ও কারাদÐাদেশ দেয়। নুরসি নাস্তিক্যবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ  গ্রহন করে নির্বাসিত ও কারাবস্থায় লিখনি ও গবেষনা চালিয়ে যান। এই ধাপে নুরসির বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক ব্যপক উন্নতি ঘটে। তাই তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন থেকে নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেন। তিনি বলেছেন,

‘কুরআনের খিদমাতই আমাকে জোরপূর্বক রাজনীতি ও রাজনৈতিক জগৎ- এমনকি রাজনীতির ভাবনা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি আখিরাত নিয়ে ব্যাস্ত। তাই রাজনীতিকে তালাক দিয়েছি এবং দুনিয়া থেকে মুক্ত হয়েছি’।

তিনি এমনকি প্রায়ই বলতেন, ‘আমি শয়তান ও রাজনীতি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি।’ এই ধাপে নুরসি নিজেকে ‘নতুন সাঈদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

চতূর্থ ধাপ (১৯৪৯-১৯৬০): এই সময় নুরসি কারামুক্তি পান। তাঁর উপর অর্পিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলে স্বাধীন ভাবে পাঠদান, সংস্কার ও দাওয়াতি কাজের সুযোগ পান। এ সময়ে নুরসির সবগুলো রিসালা রচনাসমগ্র আকারে প্রকাশিত হয়। প্রচার বিমুখ এই মানুষটি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর মহান সংস্কারক ও মুসলিম তুরস্কের জনক। তার বর্ণাঢ্য জীবন ও শিক্ষা নিয়ে আজ বিশ্বজুড়ে গবেষণা হচ্ছে।

রাসাইল-ই-নুরের পরিচয় ও বিষয়বস্তু

রাসাইল-ই-নুর হচ্ছে ইমাম বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসির রচনা সমগ্র। বিভিন্ন সময়ে নাস্তিক ও দার্শনিকদের ইসলাম বিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্ন, সংশয় ও বিভ্রান্তির অপনোদন সহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে রচিত প্রায় ১৩০টি পুস্তিকার সমাহার এই বিশাল সমগ্র। প্রথমবারের মতো এটি নয় খন্ডে ১৯৫৪ সালে সম্পাদিত হয়। এটা আসলে টপবিত্র কুরআনের এক বিস্ময়কর তাফসির, যা গতানুগতিক তাফসিরগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । নুরসি “রাসাইল-ই-নুর” নিয়ে বলেছেন, 

‘রাসাইল-ই-নুর হচ্ছে পবিত্র কুরআনের হাকিকতের এক শ্রেষ্ট দলিল, কুরআনের উত্তম তাফসির ও অলৌকিকতার এক উজ্জ্বল প্রদীপ আর ঐ সাগরের জলরাশির একটা ফোঁটা। রাসাইল-ই-নুর হচ্ছে কুরআন নামক সূর্যের এক ছটাক আলো এবং অফুরন্তÍ রহস্যভাÐারের একটি হাকিকত। রাসাইল-ই-নুর হচ্ছে কুরআনের ফয়েজের এক অনুবাদ। রসাইল-ই-নুর হচ্ছে এই যুগের কুরআনের একটা ছোট মানভি দর্পন।’ 

তুরস্কে ভৌগোলিকভাবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলন ঘটেছে। এই দেশের নাগরিক হওয়ায় নুরসি  প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শন ও তাদের গবেষণা নীতি সম্পর্কে খুব ভালো করে জানতেন। এজন্য তিনি তাঁর গবেষনায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনকে কুরআনের হিকমত দিয়ে চুলচেঁড়া বিশ্লেষণ করে তার উপর নির্মাণ করেছেন বিশ্বাসের দূর্গ।

রাসাইল-ই-নুরে ঈমান, ইসলাম, ইহসান, কুরআন, দাওয়াহ, দর্শন,  পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস, ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা, জীবন ও সৃষ্টি দর্শন, কুরআনের হাকীকত ও নিগূঢ় রহস্য সহ নানা বিষয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। নুরসি পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র, ওসমানী খিলাফাতের পতন ও নাস্তিকতার উত্থানের সাক্ষী। তাই তাঁর রচনার উদ্দেশ্যই ছিল মুসলিমদের ঈমানের ভীত মজবুত করা।

রাসাইলের ১৩০টি পুস্তিকার মধ্যে ১৭টি আরবিতে। বাকিগুলো আরবী বর্ণমালায় লিখিত তুর্কী ভাষায়। এছাড়া ইংরেজি বর্ণমালায় পরিবর্তিত তুর্কী ভাষায় এবং কুর্দি ভাষায়ও তিনি কিছু পুস্তক রচনা করেছেন। আতার্তুকের শাসনামলে ধর্মচর্চা ও ধর্মীয় পুস্তক ছাপা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকা সত্তেও রাসাইল-ই-নুরের বিভিন্ন পুস্তকের লক্ষ লক্ষ পান্ডুলিপি সমগ্র তুরস্ক জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। তুরস্কে আজ যতটুকু ইসলাম আছে, নির্দ্বিধায় বলা যায়, সবটুকুই রাসাইল-ই-নুরের ফসল ও কারামাত। এখনও রাসাইলের আবেদন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পৃথিবীর সবগুলো প্রধান ভাষাতেই এটা অনূদিত হয়েছে।

রাসাইল-ই-নুরের প্রধান বৈশিষ্ট হচ্ছে, ইমাম নুরসি তাঁর লেখায় পাঠকের চিন্তাধারাকে শুধু সম্বোধন করেননি, যেটা দার্শনিকরা করেছেন। আবার শুধু শরীরকেও লক্ষ্য করেননি, যা ফুকাহায়ে কিরামগণ করেছেন । কেবল অন্তরকেও তিনি উদ্দেশ্য করেননি, যা কিছু কিছু সুফিসাধক করেছেন। এর বদলে তিনি সার্বিকভাবে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি, দেহ, আত্মা ও অনুভূতি- সবকিছুকে সম্বোধন করেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল একটি মানুষ সামগ্রিক অর্থাৎ শারিরীক, মানসিক ও আত্মিক উন্নতি। এভাবে রাসাইল-ই-নুর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে ঈমানের মশাল জালিয়েছে। পথহারা পথিক পেয়েছে আলোর সন্ধান। তৃষ্ণার্ত আত্মা খুজে পেয়েছে পানির উৎস। কিন্তু কীভাবে রাসাইলের লেখক নিজে এমন আধ্যাতিা¥কতা ও উন্নত চিন্তাধারার পরশ পেলেন, সেই প্রসঙ্গ যদি আমরা খুঁজি, শায়খ আব্দুল কাদির জিলানি র. এর নাম সবার আগে চলে আসবে।  

নুরসির আধ্যাত্মিক জীবন

নুরসির জন্ম হয়েছিল এক আধ্যাত্মিক পরিবারে তাঁর পিতামাতা নকশবন্দি তরিকার অনুসারী ছিলেন। দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমানে তাঁর আধ্যাত্মিক পরিচয় মুছে দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। নুরসির রচনা সমগ্রর নাম রাসাইল-ই-নুর নাম রাখার পেছনেও তাঁর আধ্যাত্মিক চেতনা বিদ্যমান। এমন নামকরণের কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, ‘আমার নকশবন্দি তরিকার উসতায সাইয়্যেদ নুর মুহাম্মাদ এবং কাদেরিয়া তরিকার উসতায নুর উদ্দীন।’ নুরসি শায়খ সাইয়্যেদ নুর মুহাম্মাদ র. এর কাছে নকশবন্দি তরিকার দীক্ষা নিয়েছিলেন ১৮৮৮ তে।

এ ঘটনার সাথে আমরা সানাউল্লাহ পানিপথির তাফসিরে মাজহারির নামকরণের মিল খুঁজে পাই। তিনিও তাঁর পীর ও মুর্শিদ মির্জা মাজহার জানে জাঁর নামানুসারে তাফসিরের নাম রেখেছিলেন।

নুরসির বেড়ে উঠাও ছিল এক আধ্যাত্মিক সমাজে। তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনগঠনে পরিবার, সমাজ, নকশবন্দি ও কাদেরিয়া তরিকার দীক্ষা বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছে। নুরসি তাসাউফ চর্চা করে এমন এক স্তরে পৌছান যে, অভিভূত হয়ে লক্ষ্য করেন, সমস্ত তরিকা আসলে কুরআন থেকেই আহরিত। তাই নুরসির তাসাউফ চর্চা নিছক পরিবার কিংবা সমাজ অনুসৃত ছিল না। তিনি বরং গবেষনা ও অভিজ্ঞতার আলোকে আত্মশুদ্ধি ও তরিকত জীবনকে আল্লাহ প্রাপ্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহন করেছিলেন।

তাসাউফ সংস্কারেও নুরসির অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন নকশবন্দি ও কাদেরিয়া তরিকার বিশেষ শিক্ষা ছাড়াও বড় বড় সুফি স্কলারদের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিলো। তাসাউফকে তিনি সুলুক, বিলায়াহ, তরিকাহ ইত্যাদি পরিভাষা দ্বারাও প্রকাশ করেছেন । তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, আল্লাহপ্রাপ্তির উপায় এবং পারিবারিক, সমাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মুল চাবিকাটি হচ্ছে আত্মসংস্কার ও আত্মশুদ্ধি। তাই তিনি অন্তরের ব্যাধি নির্ণয়পূর্বক আত্মশুদ্ধিতে মনোনিবেশ করেছিলেন। আদর্শ ও আধ্যাত্মিকতার সংকটকে মুসলিমদের দুরবস্থার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি তার অধিকাংশ আলোচনায় নিষ্ঠা ও ভ্রাতৃত্বের কথা বলতেন। সতর্ক করতেন আত্মার ব্যাধি যেমন- অহংকার, আমিত্ব, স্বার্থপরতা ইত্যাদি সম্পর্কে। 

নুরসি যখন দারুল হিকমাহ’র সদস্য ছিলেন তখন নিজেকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আমি যখন সবার থেকে বেশী আত্নব্যাধিতে আক্রান্ত ও রুগ্ণ, তখন দারুল হিকমাহ’র সদস্য হয়ে মুসলিম জাতির ক্ষত সারাতে ব্যাস্ত!’ ।

ইমাম নুরসি এভাবে আত্মশুদ্ধি, আতেœাপলব্ধি ও তাসাউফ চর্চার মাধ্যমে নিজেকে পুরোনো সাঈদ থেকে নতুন সাঈদে উন্নীত করেছিলেন । 

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

নুরসির আধ্যাত্মিক জীবন গঠনে আব্দুল কাদির জিলানির প্রভাব

ইমাম আব্দুল কাদের জিলানি র. এমন এক ব্যক্তিত্ব, আনুষ্ঠানিকভাবে যার কোনো পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন হয় না, যার জীবনী ও মানাকিবের উপর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা আক্ষরিক অর্থেই হাজার হাজার। তিনি শরিয়ত ও তরীকতের আকাশে এক উজ্জ্বল লক্ষত্র। তাঁর জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার সুউচ্চ মর্যাদার কথা সমস্ত আলিমই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন।

ইমাম বাদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন গঠনে নাকশবন্দি তরিকার ইমামগন ছাড়াও আরো অনেক সুফী স্কলারদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে হুজ্জাতুল ইসলাম আবু হামিদ গাজ্জালী র. (৪৪৯/১০৫৮-৫০৫/১১১১), ইমাম আব্দুল কাদের জিলানি র. (৪৭০/১০৭৮-৫৬১/১১৬৬), ইমাম জালালুদ্দীন রুমী র. (৬০৪/১২০৭-৬৭২/১২৭৩) ও ইমাম মুজাদ্দিদে আলফে সানী আহমদ ফারুকি সিরহিন্দী র. (৯৭১/১৫৬৪-১০৩৪/১৬২৪) প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 নুরসি তাঁর শৈশবের আধ্যাত্মিক জীবনের স্মৃতিচারণ করে বলেন,

‘তখন আমার বয়স তখন নয় এর মতো। আমার পরিবার ও নিকটাত্মীয়রা সবাই নকশবন্দি তরিকার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁরা সবাই ওখানকার প্রসিদ্ধ শায়খ আল গাওস আল-খিযানি’র  তত্ত¡াবধানে তরিকতের অনুশীলন করত। তবে আমি তাদের বিপরীত ছিলাম। আমি বলতাম, ‘হে শায়খ জিলানি! আপনার জন্য সুরা ফাতেহা পড়ব। আপনি আমার হারিয়ে যাওয়া জিনিস মিলিয়ে দিন।’ যেমন, বাদাম বা অন্য যে কোন সাধারণ জিনিস। আর এটা অবশ্যই আশ্চর্য বিষয় যে, আল্লাহর শপথ! তিনি আমাকে তাঁর দোয়া দ্বারা হাজার বার সাহায্য করেছেন। আর এজন্যই আমি যখনই কোন আওরাদ এবং আযকার পাঠ করি, তখনই তাঁর সাওয়াব সবার আগে রাসুলুল্লাহ স. এবং এরপর শায়খ জিলানির উপর পৌঁছাই। যদিও তিন দিক  থেকে নকশবন্দি তরিকার দিকে আমার নিসবত। কিন্তু কাদেরিয়া তরিকার প্রতি আমার ভালোবাসা ও অনুসরণ আমার নিজের অজান্তেই জারি হয়ে গেছে। অবশ্য আমার জ্ঞান অর্জনের ব্যস্ততা তরিকত চর্চায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতো।’

নুরসি যখন প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় রুশদের হাতে বন্দী হয়ে উত্তর-পূর্ব রাশিয়ার কস্ট্রোমা শহরে আরো অন্য সৈন্যদের সাথে কারাগারে দুর্বিষহ জীবন অতিবাহিত করছিলেন। তিনি প্রায়ই পাশের একটি ছোট মসজিদে নির্জন ও একাকী হয়ে বিগলিত হৃদয়ে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করতেন। এক রাতে তিনি আল্লাহর পক্ষ্য থেকে ইলহাম প্রাপ্ত হলেন। তাঁর মনে উদয় হল,  ‘মানুষের সাথে যথেষ্ট মেলামেশা হয়েছে। এখন আমি আমার বাকি জীবন গুহায় জনবিচ্ছিন্ন হয়ে নির্জনতায় কাটাব। শেষপর্যন্ত যেহেতু একাকীই কবরে যেতে হবে, তাই এখন থেকেই একাকী ও নির্জনতাকে বেছে নিতে হবে আমাকে, যাতে করে আমি অভ্যস্ত হয়ে যাই।’

কিন্তু নুরসি যখন কারামুক্তি পেয়ে ইস্তাম্বুল গেলেন, তখন পুরোনো বন্ধুদের কাছে পেয়ে আর ইস্তাম্বুলের চাকচিক্যময় সামাজিক জীবনের মাধুর্যে অল্প সময়ের মধ্যেই ভুলে গেলেন নির্জনে সময় কাটানোর কথা। কিন্তু ঠিক দুই বছর পরেই ইমাম আব্দুল কাদের জিলানীর ফুতুহুল গাইব পড়ে তাঁর চোখ আবারও উন্মোচিত হলো।

কিছু দিন পর নুরসি আবু আইউব আল-আনসারী রা. গোরস্তানে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে অন্তরে উদয় হয়েছিলো, এই গোরস্তান ইস্তাম্বুলের অধিবাসীদের কমপক্ষে ১০০ জনকে নিজের ভেতর জায়গা দিয়েছে। অতএব হাকীমের হুকুম আমার ব্যাপারেও কোনো কমবেশি হবে না। আমাদের সবাইকে যেতে হবে। এই ভয়ানক চিন্তা মাথায় নিয়ে আবু আইউব আল আনসারী মসিজিদের ছোট্ট একটি কক্ষে ঢুকে তিনি মৃত্যুচিন্তা আর পরকালের একাকী জীবন নিয়ে ধ্যানমগ্ন হয়ে গেলেন। এভাবে কয়েকবার ঘটল। বিষণœতা তাঁকে দারুনভাবে আচ্ছন্ন করেছিল। এই বিষন্নতা পরবর্তীতে পবিত্র কুরআনের একটি নুরের রহস্য উম্মোচন ও ইমাম আব্দুল কাদের জিলানী র. এর এক রুহানী দিক নির্দেশনায় খুশি ও প্রফুল্লতায় পরিণত হয়েছিল। এরপর নুরসি কুরআনের রহস্য ও ইমাম জিলানির দিক নির্দেশনাটি উল্লেখ করে বলেন, ‘পুরো ইস্তাম্বুল শহর থেকেও ঐ গোরস্তানটি এখন আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। একাকিত্ব ও নির্জনতা মেলামেশার চেয়েও মনোরম। শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী তাঁর কিতাব ফুতুহুল গাইব এর মাধ্যমে হয়ে গেলেন আমার উসতায, আমার চিকিৎক, আমার মুরশিদ।’

আধ্যাত্মিক শিক্ষকের খোঁজে নুরসি

“পুরাতন সাঈদ” বিগত ৩০ বছর পূর্বে মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করেছিলেন যে, মৃত্যু এক ধ্রæব সত্য’।  এরপরও গভীর নিদ্রা এখনও ভাঙেনি। সাঈদ তখন একজন সহযোগী ও পথ প্রদর্শকের সন্ধান শুরু করেন। কিন্তু নানা ধরনের নানান পথ দেখে তিনি সংশয়গ্রস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় সাঈদ অনেক আশাবাদী হয়ে ইমাম আব্দুল কাদের জিলানী র. এর ফুতুহুল গাইব খুললে প্রথমেই লেখা দেখতে পেলেন,

“أنت في دار الحكمة، فاطلب طبيبا يداوي قلبك”

‘তুমি দারুল হিকমাহ-তে রয়েছ, একজন চিকিৎসক অন্বেষণ করো যে তোমার অন্তরের চিকিৎসা করবে।’

সাঈদ বলেন,

‘কি আশ্চর্য! আমি তখন দারুল হিকমাতিল ইসলামিয়্যাহ’র একজন সদস্য ছিলাম। আমি সেখানে যুক্ত হয়েছিলাম নানা সমস্যায় ক্ষত বিক্ষত মুসলিম উম্মাহর চিকিৎসার জন্য। কিন্তু আমি ছিলাম সবচেয়ে বেশী রোগাক্রান্ত। অন্য কারো চেয়ে আমার চিকিৎসাই বেশী প্রয়োজন ছিল। অন্যকে চিকিৎসা দেয়ার আগে রোগীর নিজের সুস্থ হওয়া উত্তম।

হ্যাঁ। এজন্যই শায়খ আমাকে সম্বোধন করেছেন,”তুমি একজন রোগী। তাই একজন চিকিৎসক খোঁজ, যে তোমার চিকিৎসা করবে।’

আমি বললাম, হ্যাঁ শায়খ। আপনিই তাহলে আমার চিকিৎসক হন!’

আমি ঐ কিতাবটি  পড়া শুরু করলাম। মনে হচ্ছিল শায়খ প্রতিটি কথা শুধু আমাকেই সম্বোধন করে বলছেন। তাঁর ধারালো বক্তব্য আমার অহংকারকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। প্রতিটি কথা ছিল আমার অন্তরে গভীর সার্জারির মতো, যা আমি সহ্য করতে পারিনি। কারণ তাঁর প্রতিটি কথা মনে হচ্ছিল আমাকেই উদ্দ্যেশ্য করে।

 হ্যাঁ। এ ভাবেই বইটার অর্ধেক পড়ে শেষ করলাম… পুরো শেষ করতে পারিনি, বইটি যথাস্থানে রেখে দিলাম। এর কিছুদিন পর উপলব্ধি করলাম সার্জারিগুলোর ব্যথা দূর হয়ে সে জায়গায় এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক প্রশান্তির সঞ্চার হয়েছে… আবারো পড়া শুরু করলাম। এভাবে আমি আমার “প্রথম শিক্ষক” পড়ে শেষ করলাম। এই কিতাব থেকে আমি অনেক বেশী উপকৃত হয়েছি। সূ² রহস্য হৃদয়াঙ্গমে অনেক সময় অতিবাহিত করেছি।’

            উপরুক্ত বর্ণনা সমূহ থেকে স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে নুরসির আধ্যাত্মিক জীবন গঠনে ইমাম আব্দুল কাদের জিলানী হচ্ছেন প্রথম শিক্ষক।    

নুরসির রচনায় ইমাম আব্দুল কাদের জিলানি র.

নুরসি তাঁর রাসাইল-ই-নুর সমগ্রতে অসংখ্যবার ইমাম আব্দুল কাদের জিলানির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। পশ্চিমা ভোগবাদী ও বস্তুুবাদী দর্শনের ত্রুটি বিচ্যুতি বর্ণনাপূর্বক মানব সভ্যতা গঠনে কুরআনের দর্শন ও প্রভাব বিশদভাবে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘কুরআনের আধ্যাত্মিক ছাত্র হিসাবে যারা অমর হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে ইমাম আব্দুল কাদের জিলানী একজন।’

নুরসি ইখলাসের গুরুত্ব তুলে ধরতে ইমাম জিলানির একটি বিখ্যাত উক্তির দিকে ইশারা করেছেন। সেটা হলো,

كل عمل لا إخلاص فيه فهو قشر لا لبَّ فيه

`ইখলাস বিহীন পত্যেক আমল বিচি বিহীন খোসার ন্যায়।’

অন্যত্র ইমাম নুরসি পানাহারে সংযম ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন বিষয়ক আলোচনায় ইমাম আব্দুল কাদের জিলানির প্রসিদ্ধ একটি কারামাত উল্লেখ করেছেন। তা হলো, এক বৃদ্ধা তাঁর একমাত্র সন্তানকে ইমাম আব্দুল কাদের জিলানির কাছে তালিম, তারবিয়্যার জন্য দিয়েছিলেন। একদিন সন্তানের সাথে দেখা করতে এসে তিনি দেখলেন, সে আধ্যাত্মিক সাধনায় অত্যন্ত দূর্বল ও কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছে এবং পুরোনো শুকনো এক টুকরো রুটি খাচ্ছে। সন্তানের এই দৃশ্য দেখে মমতাময়ী মায়ের খুব মায়া হলো এবং সন্তানের করুণ অবস্থার ব্যখ্যা নিতে ইমাম আব্দুল কাদের জিলানির নিকট উপস্থিত হলো। কিন্তু দেখা গেলো ইমাম নিজে ভুনা করা আস্ত মুরগি খাচ্ছেন। এটা দেখে তিনি  বললেন, ‘হে শায়খ আপনি মুরগি খাচ্ছেন আর আমার সন্তান ক্ষুধায় কাতর হয়ে মারা যাবার উপক্রম!’ তখন শায়খ মুরগিকে ডেকে বললেন, ‘হে মুরগি! তুমি আল্লাহর ইচ্ছায় উঠে দাড়াও’। সাথে সাথে পরিপূর্ণ একটি মুরগি ইমাম আব্দুল কাদের জিলানির সম্মানে লাফ দিয়ে খাবার প্লেট থেকে নেমে পড়লো। তিনি এবার সেই বৃদ্ধাকে বললেন, আপনার সন্তান যখন এমন স্তরে পৌঁছাবে, তখন মুরগি খাবে।’ নুরসি বলেন, ইমাম আব্দুল কাদের জিলানীর এই উক্তির মর্মার্থ হচ্ছে, যখন আপনার ছেলের রুহ তার দেহের উপর রাজত্ব কায়েম করবে, তাঁর অন্তর নফসের উপর প্রধান্য বিস্তার করবে, আকল তাঁর প্রবৃত্তির পরিচালক হবে এবং সে যদি সুস্বাদু খাবার আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য অন্বেষণ করে, তখনই প্রয়োজনমাফিক ও ইচ্ছেমতো যে কোন সুস্বাদু খাবার গ্রহন করতে পারবে।’

নুরসি নকশবন্দি তরিকার মূলনীতি নিয়ে আলোচনা ও সমকালীন ঈমানের দুরাবস্থার প্রেক্ষিতে বলেন,

‘তাসাউফ হচ্ছে ঈমানের হাকীকত আর যদি ইমাম আব্দুল কাদের জিলানি, ইমাম বাহা উদ্দীন নকশবন্দি ও ইমামে রাব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানীর মতো বড় বড় ইমাম গন এই যুগে থাকতেন, তাহলে তাঁরা তাঁদের সব কিছু বিসর্জন দিয়ে আকীদা ও ঈমানের হাকীকতের ভীত মজবুত করতেন।’

নুরসি বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনায়, বিভিন্ন মাসয়ালা বয়ানের ক্ষেত্রে ইমাম আব্দুল কাদির জিলানি র. এর উপমা দিতেন যেমনঃ ফেরেশতা ও জিনের সাথে মানুষের সাক্ষাত ও কথা বলা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনায় বলেছেন, ‘যারা রাসুলুল্লাহ স. এর নুরে নুরান্নিত হয়েছেন, তাঁর আদর্শে আদর্শবান হয়েছেন, তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন, যেমন- ইমাম আব্দুল কাদের জিলানি র. ও তাঁর মতো সুফীসাধক, আউলিয়া, ওলামায়ে কিরাম, কুতুবগন প্রমুখ যে ফেরেশতা ও জিনের সাথে সাক্ষাত ও আলাপ করতেন, তা অকাট্য ভাবে প্রমাণিত ।

 অন্যত্র নুরসি রাসুলুল্লাহ স. এর একটি বৈশিষ্ট আলোচনা করেছেন। তা হলো, তাঁর শরীর মোবারকে মাছি কিংবা কষ্টদায়ক কোন কিছু বসত না। তিনি এই বৈশিষ্টটি বর্ণনা করতে গিয়ে ইমাম  আব্দুল কাদির জিলানির প্রসঙ্গও টেনে বলেছেন, ‘ইমাম আব্দুল কাদের জিলানি র.এর গায়েও মাছি বসত না। এটা তিনি রাসুলুল্লাহ স. এর কাছ থেকে পেয়েছেন।’

নুরসি তাঁর রাসাইল-ই-নুর সমগ্রে অসংখ্য বার ইমাম আব্দুল কাদের জিলানী থেকে  দিক নির্দেশনা, পরামর্শ, সুসংবাদ ইত্যাদি প্রপ্তির কথা ব্যক্ত করেছেন। এগুলো প্রমান করে নুরসি ও তাঁর শায়খ আল বাযুল আশহাব আব্দুল কাদির জিলানি র. এর মাঝে এক গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ছিল।

আমরা নুরসির রচনাসমগ্র অধ্যায়ন করে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি:

১। ইমাম বাদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি ছিলেন কালজয়ী এক ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন শতাব্দীর এক মহান সংস্কারক ও মুসলিম তুরষ্কের আধ্যাত্মিক জনক। তার বর্ণাঢ্য জীবন ও শিক্ষা নতুন প্রজন্মকে আলো দেখাবে।

২। রাসাইল-ই-নুর হচ্ছে পবিত্র কুরআনের হাকিকতের এক শ্রেষ্ঠ দলিল, কুরআনের উত্তম তাফসির ও অলৌকিকতার এক উজ্জ্বল প্রদীপ। রাসাইল-ই-নুর জীবন, ধর্ম, দর্শনের এক বুদ্ধিবৃত্তিক সামাধান।

৩। নুরসির জন্ম এক সুফী পরিবারে। তাসাউফ চর্চায় তিনি নকশবন্দি ও কাদেরিয়া তরিকার দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। 

৪। নুরসির আধ্যাত্মিক জীবন গঠনে ইমাম আব্দুল কাদের জিলানির রচনাবলী “প্রথম শিক্ষক” হিসেবে বিবেচিত। তাছাড়া ইমাম জিলানী হচ্ছেন ইমাম নুরসির আধ্যাত্মিক চিকিৎসক, মুরশিদ, পথ প্রদর্শক ও  দিক নির্দেশক।

৫। ইমাম আব্দুল কাদের জিলানী শরীয়ত ও তরিকতের জ্ঞানের এক মহা সমুদ্র আর ইমাম নুরসি ঐ সমুদ্রের একটা মুক্তা।

৬। এ যুগেও আমরা ইমামুনা সায়্যিদুনা আব্দুল কাদির জিলানি র. এর আদর্শ ও শিক্ষা অনুসরণ করে সাঈদ নুরসির মতো ইসলামের পক্ষে অবদান রাখতে পারি। হতে পারি যুগশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, স্মরণীয় ও বরণীয়।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাঁদের মতো ব্যক্তিত্বদের পরশে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

গ্রন্থপঞ্জী

আল-ইয়াফেয়ী, আফিফ উদ্দীন আবিস সাদা’ত, আবু মুহাম্মাদ আবদিল্লাহ ইবনে আসআদ “মেরায়াতুয যামান”, বৈরুত: দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যাহ, ১৯৯৭ খ্রি.

আমাদ কাযিম মুহাম্মদ সালেহ, আল-হিজাজুল ফালসাফী ফি বারহানাতি হাকায়িকুল কুরআন ফি ফিকরি বাদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি, কুয়ালালামপুর: মালায় বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৫ খ্রি.

আওয়িস, প্রফেসর ড. আব্দুল হালিম, রাজুলুল কুরআন ও সানায়াতুল ইনসান, কায়রো: দারুন নাইল, ২০০৯ খ্রি.

ইবনে তাইমিয়া, আহমদ ইবনে আব্দুল হালিম ইবনে আব্দুস সালাম, মাজমুউল ফাতাওয়া, মাদিনাতুল মুনাওরাহ: মাজমাউল মালিক ফাহাদ, ১৯৯৫ খ্রি.

জিলানি, ইমাম মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির, ফাতহুর রাব্বানী, কায়রো: মাকতাবাতুস সাকাফাতুদ দিনিয়্যাহ, তাবি

সালেহী, ইহসান কাসেম, সিরাতু জাতিয়া, কায়রো: শিরকাতু সুযলার, ২০১১ খ্রি.

Mohammad Nurunnabi, Mohammad Morshedul Haque. Social Reformation in the

 Thought of Bediuzzaman Said Nursi: An Analytical Study. al-Burhān: Journal of Qurʾān and Sunnah Studies, Vol 4, No 2 (2020).

Mustafa Adardawr, “Notable Events in Contemporary History and Their

 Influence on Nursi’s life and His School of Thought” Al-Nur Journal of

Academic Studies On Thought. Al-Nur Journal of Academic Studies on

 Thought and Civilization. Vol-8, No-15 (2017). 

এছাড়া সাঈদ সাঈদ নুরসি র. রচিত আল-মুলাহিক, আল-মাকতুবাত, সায়কালুল ইসলাম, আল-লুমায়া’ত, আশ-শুয়ায়াত ও আল-মাসনাভী গ্রন্থ থেকে সাহায্য নেয়া হয়েছে। সবগুলো বই কায়রোর শিরকাতু সুযলার থেকে ২০১১ খ্রি. ইহসান কাশেম সালেহি কর্তৃক আরবিতে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত।

ড. মুহাম্মদ নুরুন্নবী আল আজহারী
সহযোগী অধ্যাপক, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি। |  + posts

ড. মুহাম্মদ নুরুন্নবী আল আজহারী একজন সুফি গবেষক, লেখক এবং ইসলামী আইনজ্ঞ। তিনি সওতুল মদিনার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও ২০২০ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তিনি সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top