
মুখতার সাকাফি তায়েফের বিখ্যাত ও সম্ভ্রান্ত বনু সাকিফ গোত্রের লোক ছিল৷ তার বাবা হজরত আবু উবাইদ রা. একজন সর্বজন সম্মানিত সাহাবি ছিলেন, যাকে হজরত ওমর ফারুক রা. তাঁর খেলাফাতকালে এক জিহাদের আমির বানিয়ে পাঠান। সেই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। মুখতার সাকাফির দাদা মাসউদ আস সাকাফি ইসলাম পূর্ব যুগে তায়েফের সবচাইতে প্রভাবশালী মানুষ ছিলেন।
আল্লাহ তায়ালা মক্কার কাফির মুশরিকদের দাবি সম্পর্কে বলেন,
وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هَٰذَا الْقُرْآنُ عَلَىٰ رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ
তারা (মক্কার কাফির মুশরিকরা) বলে, কোরআন কেন দুই জনপদের কোন প্রধান এক ব্যক্তির উপর অবতীর্ণ হল না? (৪৩ঃ৩১)
অধিকাংশ মুফাসসির বলেছেন, সূরা জুখরুফের এই আয়াতে যে দুই জনপদের কথা বলা হয়েছে তা মক্কা ও তায়েফ। আর তায়েফের যেই প্রভাবশালী ক্ষমতাবান মানুষকে কুরআন মাজিদ অবতীর্ণের জন্য যোগ্য মনে করেছিল তারা (নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক), সে এই মাসউদ আস সাকাফি ছিল বলে অনেকে মত দিয়েছেন।
প্রথমেই বলে নিতে চাই, মুখতার সাকাফি ইসলামের ইতিহাসের বিতর্কিত একজন রহস্যময় মানুষ। আমি ব্যক্তিগতভাবে মুখতার সাকাফি সম্পর্কে শেষ সিদ্ধান্ত দেব না৷ তার বিষয়টি আমি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করলাম। তবে শিয়া ও সুন্নী উভয় সোর্স থেকে যা জেনেছি তা আজ বলব আপনাদেরকে ইন শা আল্লাহ।
শিয়া ও সুন্নীরা পরস্পর বিরোধী দুই বিপরীত মতে বিভক্ত তার ব্যাপারে৷ তবে জানা যায় যে, প্রথম যুগের শিয়ারাও তার উপর অখুশি ছিল। কারণ মুখতার সাকাফি মাওলা আলি আ. এঁর সন্তান কিন্তু হজরত ফাতেমাতুজ জাহরা রা. আ. এঁর সন্তান নন এমন একজনকে (ইমাম হাসান হোসাইন রা. আ. এঁর সৎভাই) হজরত মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যাহ রাহ. কে মাহদি হিসেবে ঘোষণা দেন। কিন্তু কারবালার জমিনে ইমাম হোসাইন আ. এঁর নির্মম শাহাদাতের প্রতিশোধ নেয়ার কারণে পরবর্তীতে শিয়া- রাফেজিরা মুখতার সাকাফিকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করে ও তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগকে মক্কা মদিনা তথা হেজাজের শাসক হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর রা. এবং সিরিয়ার শাসক জালিম ওমাইয়াদের ভিত্তিহীন অপপ্রচার বলে জোর দাবি করে। মুখতার সাকাফি এখন অধিকাংশ শিয়াদের কাছে হিরো।
যাইহোক, জন্ম ও বেড়ে ওঠা তায়েফে হলেও হজরত আলি আ. এঁর খেলাফাতকালে মুখতার সাকাফি তায়েফ ছেড়ে কুফায় গমন করে এবং মাওলা আলি আ. এঁর অনুসারী হন। বনু সাকিফ গোত্রের বেশ প্রভাব থাকায় এবং তার বীরত্ব ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে সে কুফাতে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে সুন্নী ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুসারে, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম আসন পূজার কুপ্রথা শুরু করেছিল মুখতার সাকাফি। একটা খুবই সুন্দর চেয়ার রেখেছিল সে কুফাতে। আর দাবি করেছিল, মাওলা আলি আ. এঁর ৩য় পুত্রসন্তান (ইমাম হাসান ও হোসাইন আ. এঁর বৈমাত্রেয় ভাই) হজরত মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যাহ রাহ. এই চেয়ারে গায়েবিভাবে আছেন এবং আমাকে টাইম টু টাইম সব আদেশ দিচ্ছেন। সে আরো দাবি করে, মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যাহ রাহ. ই হচ্ছেন ইমাম মাহদি, আর আমি তার ডেপুটি। এটাই ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মাহদি দাবির ঘটনা। যদিও হজরত মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যাহ রাহ. এসব থেকে মুক্ত ছিলেন, তিনি এসব বিষয় জানার পর সকল কিছু অস্বীকার করেন। তিনি এসবের কিছুই মানতেন না৷ মুখতার সাকাফির অনুসারীদের বেশিরভাগই ছিল পারস্যের অগ্নি উপাসনা থেকে বের হয়ে আসা নও মুসলিম। সেজন্য তাদেরকে এসব বুঝানোও নাকি তার জন্য সহজ হয়।
সুন্নী ইতিহাস অনুসারে, সে পরবর্তীতে এটাও দাবি করে যে, জিবরিল আ. মিকাইল আ. আমাকে অনেক আদেশ নিজে এসে দিচ্ছেন। নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক।
কিছু কিছু ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে, ইয়াজিদের জালিম সেনাপতিদের বিরুদ্ধে তার রাজনৈতিক মুভমেন্ট পরিচালনা করতে ও মানুষকে তার দিকে আকর্ষিত করতে নাকি এটা খুব প্রয়োজন ছিল। তার এসব মতবাদকে কিসানিয়্যাহ বা মুখতারিয়া মতবাদ নামে ইতিহাসে চিহ্নিত করা হয়। তবে এই মতবাদ এখন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত।
যাইহোক, কারবালার ঘটনার আগে ইমাম হোসাইন আ. কে যারা যারা কুফাতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, তাদের মাঝে মুখতার সাকাফি ছিল অন্যতম। কারবালার ঘটনার সময় সে জেলে বন্দী ছিল। কুফার পরিস্থিতি বুঝার জন্য ইমাম হোসাইন রা. কর্তৃক প্রেরিত তাঁর চাচাত ভাই হজরত মুসলিম বিন আকিল রাহ. কে মুখতার সাকাফি তার ঘরে আশ্রয় দেয় এবং উনাকে প্রাণপণ সাহায্য করবে বলে ওয়াদা দেয়৷ এ কারণে কুখ্যাত ইবনে জিয়াদ মুখতার সাকাফিকে বন্দী করে এবং ছলে বলে কৌশলে মুসলিম বিন আকিল রা. কে দুই সন্তানসহ নির্মমভাবে শহীদ করে।
মজার বিষয় যে, বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এঁর কাছে মুখতার সাকাফির আপন বোন সাফিয়্যা বিন্তে আবি উবাইদ রাহ. র বিয়ে হয়েছিল। মুখতার সাকাফি তার বোনের জামাই আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এঁর কাছে অনুরোধ করে, তিনি যেন ইয়াজিদের কাছে সুপারিশ করেন তাকে মুক্ত করে দিতে। তাঁর সুপারিশেই ইয়াজিদ মুখতারকে জেল থেকে ছেড়ে দেয় কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পরে। কুফার জেল থেকে মুক্ত হয়ে মুখতার সাকাফি মক্কা শরীফে হেজাজের আমির হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. (উল্লেখ্য কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর তিনি ইয়াজিদের দুঃশাসন থেকে বের হয়ে হেজাজ প্রদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেন) এঁর আশ্রয়ে চলে যায় এবং সে বীরত্বের পরিচয় দিয়ে ইবনে জুবায়ের রা. এঁর বিশ্বস্ত ও প্রভাবশালী আর্মি জেনারেলে পরিণত হয়৷ জালিম ওমাইয়াদের দুঃশাসন থেকে সে বসরা ও কুফা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অতঃপর সে তাকে কুফার আমির বানানোর জন্য হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. কে অনুরোধ করে। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. তা করলেন না। এতে সে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে৷ অবস্থা সুবিধাজনক না বুঝতে পেরে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. মুখতার সাকাফিকে গ্রেফতার করলেন।
পরে আবারো হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. বন্ধুপ্রতিম হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এঁর সুপারিশে তাকে মক্কার কারাগার থেকে ছেড়ে দেন। এবার সে তার বনি সাকিফ গোত্র ও কুফায় তার পূর্ব জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে বাহিনী গঠন করে কুফা দখল করে নেয়। কুফা দখল করে তার প্রথম কাজই হয় কারবালার জমিনে প্রিয় নবী করিম ﷺর কলিজার টুকরো নাতি হজরত ইমাম হোসাইন আ. এঁর শাহাদাতকারী কুখ্যাত অভিশপ্ত ইবনে জিয়াদ, শিমার, ওমর ইবনে সাদ (ঘটনাক্রমে এই অভিশপ্ত ওমর ইবনে সাদ বিখ্যাত সাহাবি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত হজরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. এঁর সন্তান। এই কুখ্যাত ওমর ইবনে সাদ মুখতার সাকাফির সৎবোনের স্বামী ছিল। তারপরও তাকে ডেকে এনে হত্যা করে, কারণ এই ওমর ইবনে সাদ সরাসরি ইমাম হোসাইন আ. এঁর শাহাদাতে কারবালার জমিনে নেতৃত্ব দিয়েছে। লানাতুল্লাহি আলাইহি) ও হারমালাসহ আরো যারা এই নৃশংস ঘটনার সাথে জড়িত ছিল তাদেরকে হত্যা করে জাহান্নামে প্রেরণ করে। এই নরাধমদের কর্তিত মাথা গুলো মদিনা শরিফে প্রিয় নবী করিম ﷺর পরিবার আহলে বায়তের সদস্যদের কাছে উপহার হিসেবে প্রেরণ করে। মুখতার সাকাফির এই কাজটি অনন্য অসাধারণ ছিল৷ এখানে শিয়া-সুন্নী সবাই একমত।
পরে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. কর্তৃক বসরাতে নিযুক্ত আমির তাঁরই ছোটভাই হজরত মুসয়াব ইবনে জুবায়ের রা. মুখতার সাকাফির হাত থেকে কুফাকে পুনরুদ্ধার করার জন্য বিশাল বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করেন এবং মুখতার সাকাফিকে কতল করেন। বর্ণিত আছে, তার কবর হজরত মুসলিম বিন আকিল রা. এঁর মাজারের পেছনে। কেউ কেউ বলেন, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. তার লাশকে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন কথিত সেই মিথ্যা নবুয়াত দাবি করার অপরাধে।
তবে সুন্নী সোর্স থেকেই জানা যায়, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ও আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. মুখতার সাকাফিকে নবুয়াতের দাবি করার মত ভয়ানকতম কুফরির অপরাধে অপরাধী বলে মনে করতেন না। কারণ হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বিশেষ করে, মুখতার সাকাফি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মসজিদে তারই অনুসারীদের পেছনেই নামাজ পড়েছেন বলেও গ্রহণযোগ্য বর্ণনাতে এসেছে সুন্নীদের হাদিসের কিতাবে। যদি মুখতার সাকাফি আসলেই এরকম কুফরি মতবাদ প্রচার করত ( জিবরিল আ. মিকাইল আ. এসে তাকে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে দাবি করা, যা ইন্ডাইরেক্টলি নবুয়াত দাবির মত কুফরি) তবে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এঁর মত জলিল কদর সাহাবি তার প্রতিষ্ঠিত মসজিদে তার অনুসারীদের পেছনে নামাজ পড়তেন না৷ এই আর্গুমেন্টটি মুখতার সাকাফি ও শিয়াদের পক্ষে যায়।
কিন্তু সুন্নীদের অন্যতম নির্ভরযোগ্য হাদিসের কিতাব সহিহ মুসলিম শরিফের দীর্ঘ বর্ণনাতে এসেছে (হাদিস নং-৬৩৯০) , ৭৩ হিজরি সনে ওমাইয়াদের গুন্ডা ও কুফার গভর্নর জালিম নিকৃষ্ট হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ মক্কা শরিফ অবরোধ করে এবং হেজাজের (মক্কা-তায়েফ ও মদিনা) শাসক বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. কে শহীদ করে এবং তাঁর দেহ মুবারককে কাবা শরিফের সামনে ঝুলিয়ে রাখে।
উল্লেখ্য যে, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি ও প্রিয় নবীজির ﷺর আপন ফুফাত ভাই হজরত জুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. এঁর সন্তান। তাঁর নানাজী ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা.। তাঁর আম্মা ছিলেন হজরত আসমা বিন্তে আবি বকর রা.।
জালিম পাপিষ্ঠ হাজ্জাজ বিন ইউসুফ হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা. কে শহীদ করে দেহ মুবারককে ঝুলিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। সেই জালিম হাজ্জাজ শতবর্ষী বিশিষ্ট ও সম্মানিত সিনিয়র সাহাবিয়া হজরত আসমা বিন্তে আবি বকর রা. (আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রা. এঁর ১০ বছরের বড় বোন)কে নিয়ে আসার জন্য লোক প্রেরণ করে, তাঁরই সন্তানের ঝুলন্ত লাশ দেখানোর জন্য। হজরত আসমা বিনতু আবি বকর রা. বলেন, আমি কোনভাবেই যাব না।
দ্বিতীয়বার একজন সৈন্যকে সে আদেশ দেয়, যাও আসমা বিনতু আবি বকরকে ধরে নিয়ে আস। যদি না আসতে চায়, তবে তাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে আস। নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক। মায়াজাল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহাল আজিম।
সেই সৈন্য গিয়ে বলল, হে আসমা বিনতু আবি বকর! আপনি চলুন আমার সাথে। আপনি না গেলে আপনাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দিয়েছে আমির হাজ্জাজ।
হজরত আসমা বিনতু আবি বকর রা. রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলেন, তুই পারলে আমালে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে যা। আমি যাব না আমার সন্তানের ঝুলন্ত লাশ দেখার জন্য৷
হজরত আসমা বিনতু আবি বকর রা. এঁর অগ্নিমূর্তি দেখে সৈন্যটি ভয় পেয়ে ফিরে গেল। জবাব শুনে হাজ্জাজ নিজে চলে আসল, আসমা বিনতু আবি বকর রা. এঁর কাছে। এসে বলল, হে আসমা! তুমি কি দেখনি আমি তোমার ছেলের দুনিয়ার জীবন কিভাবে বরবাদ করে দিয়েছি?
আসমা রা. বললেন, তুই আমার ছেলের দুনিয়ার জীবন শেষ করেছিস, আর আমার ছেলের কারণে তোর আখিরাত বরবাদ হয়ে গেছে।
আমি আরো শুনেছি, হে হাজ্জাজ! তুই নাকি আমার ছেলেকে গালি দিস “জাতুন নিতাকাইন” বা “দুই কোমরবন্দ ওয়ালি” র সন্তান বলে। তুই কি জানিস না কেন আমাকে দুই বেল্ট বা দুই কোমরবন্দ ওয়ালি ডাকা হয়? একটা তো স্বাভাবিক কোমরবন্দ বা বেল্ট যা নারীরা তাদের পাজামা আটকে রাখতে পরিধান করে। আরেকটা কোমরবন্দ আমি এক্সট্রা পরিধান করতাম যখন হুজুর রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং আমার পিতা হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা. গারে সওর নামক গুহায় (হিজরত করে মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার পথে) আশ্রয় নিয়েছিলেন তখন। তাঁদের দুজনের জন্য খাবার পানীয় আমি সেই (এক্সট্রা) কোমরবন্দে বেঁধে নিয়ে পাহাড় বেয়ে গায়ে সওরে ওঠতাম। সেজন্য আমাকে (ভালোবেসে, সম্মান করে) সবাই ডাকে দুই কোমরবন্দ ওয়ালি।
তবে হে হাজ্জাজ! আমি নবী করিম ﷺ কে বলতে শুনেছি, “বনু সাকিফ বা সাকিফ গোত্রে একজন কাজ্জাব বা মিথ্যাবাদী আসবে” যাকে আমরা আগেই দেখেছি, ‘আর একজন জালিম অন্যায় হত্যাকারী আসবে”। সেই জালিম অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যাকারী হচ্ছিস তুই হাজ্জাজ”। একথা শুনে হাজ্জাজ আর একটা কথাও না বলে সেখান থেকে চলে গেল। এই নির্মম ও দুঃখজনক ঘটনার মাত্র তিন মাস পর হজরত আসমা বিনতু আবি বকর রা. ১০০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
উল্লেখ্য যে, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আস সাকাফি ও মুখতার সাকাফি দুজনই বনু সাকিফ গোত্রের লোক ছিল।
এই হাদিসের শেষ দিকের “বনু সাকিফ বা সাকিফ গোত্রে একজন কাজ্জাব বা মিথ্যাবাদী আসবে, যাকে আমরা আগেই দেখেছি” এই অংশ থেকে সুন্নী ঐতিহাসিক ও হাদিসের ব্যাখ্যাকারগণ বলেছেন, যদিও আসমা রা. মুখতার সাকাফির নাম নেন নাই এখানে, কিন্তু কাজ্জাব বা মিথ্যাবাদী দ্বারা মুখতার সাকাফিই উদ্দেশ্য, সে ছাড়া আর কেউ সাকিফ গোত্র থেকে ওহী বা নবুয়াতের দাবি করে নাই । উল্লেখ্য যে, মিথ্যা ওহী বা নবী দাবিকারীদেরকে কাজ্জাব বলে গেছেন নবী করিম ﷺ। মুসায়লামাতুল কাজ্জাব তার অন্যতম।
যাইহোক, মুসলিম শরিফের হাদিসেই এসেছে,
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. এঁর ঝুলন্ত সেই লাশের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, দেহ মুবারক দেখে বললেন, আস্সালামু ‘আলাইকা ইয়া আবা খুবায়ব! আস্সালামু ‘আলাইকা ইয়া আবা খুবায়ব! আস্সালামু ‘আলাইকা ইয়া আবা খুবায়ব! আল্লাহ্র শপথ! আমি অবশ্য আপনাকে এ থেকে বিরত থাকতে বলেছিলাম। আল্লাহ্র শপথ! আমি অবশ্য আপনাকে এ থেকে নিষেধ করছিলাম, আমি অবশ্য আপনাকে এ থেকে নিষেধ করছিলাম। আল্লাহ্র শপথ! আমি যদ্দুর জানি আপনি ছিলেন সর্বাধিক সিয়াম পালনকারী, সর্বাধিক সলাত আদায়কারী এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক সম্মিলনকারী।
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর এ অবস্থান (থামা) ও তাঁর বক্তব্য হাজ্জাজের নিকট পৌঁছল। তখন সে ‘আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়রের নিকট লোক প্রেরণ করল এবং তাঁকে শূলীর উপর থেকে নামানো হলো। তারপর ইয়াহূদীদের কবরস্থানে তাঁকে নিক্ষিপ্ত করা হলো। নাউজুবিল্লাহ মিন জালিম৷ মায়াজাল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহাল আজিম।
সর্বশেষে আবারো বলছি, মুখতার সাকাফি আসলেই নবী দাবি করেছিল কীনা, সে ভ্রান্ত ছিল কীনা বিষয়টি কিছুটা ধুম্রজাল মিশ্রিত।
কাজেই এর সত্যতা সম্পর্কে আল্লাহ পাকই অধিক অবগত৷ আল্লাহর পাকের কাছেই বিষয়টিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে সোপর্দ করছি। কিন্তু নবি করিম ﷺর কলিজার টুকরো নাতি ইমাম হোসাইন রা. আ. ও কারবালা এবং কুফাতে শহীদ হওয়া নবী পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণের শাহাদাতের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য জাতি অবশ্যই তার কাছে কৃতজ্ঞ।

