তরিকায়ে কাদেরিয়া: একটি পর্যালোচনা

হাদীসে জিবরীল অনুযায়ী দ্বীনের তিনটি মৌলিক দিক হচ্ছে ইমান, ইসলাম ও ইহসান। এই তিনটি থেকে বিকশিত হয়েছে তিনটি বিশেষ ইলম (জ্ঞান) যথা- ইলমুল কালাম বা আকাঈদ শাস্ত্র, ইলমুল ফিকহ বা বিধি বিধান ও ইলমুত তাসাওউফ। ইলমুত তাসাওউফের প্রাতিষ্ঠানিক রুপায়নে আবির্ভাব হয়েছে বিভিন্ন তরিকা বা সুফি মানহাজ। তরিকা সমূহের মধ্যে বড় পীর মুহিউদ্দীন শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) প্রবর্তিত কাদেরিয়া তরীকা অন্যতম প্রাচীন ও প্রধান তরিকা। শায়খ জিলানী (রহ.)এর নামানুসারে কাদেরিয়া তরিকার নামকরণ করা হয়। এই তরিকার উদ্ভব ষষ্ঠ হিজরিতে (বারো শতকে)।১
হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দ মুতাবেক ৪৭০ হিজরীর রমযান মাসের ১ তারিখ সেহরির ওয়াক্তে পারস্যের কা¤িপয়ান সাগরের দক্ষিণ উপক‚লে জিলান বা গীলান অঞ্চলের নায়ক মহল্লায় হযরত ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বংশধারায়। অন্যদিকে তাঁর আম্মা সায়্যিদা উম্মুল খায়ের ফাতিমা (রহ.) ছিলেন হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর বংশধারার। সেইসূত্রে তিনি ছিলেন ‘নাজীবুত তারাফাইন’ অর্থাৎ উভয় দিক থেকে সায়্যিদ। গাউসুল আযম হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) আব্বা সায়্যিদ আবু সালিহ মূসা জঙ্গী (রহ.) ছিলেন সে যুগের একজন বিখ্যাত সূফী এবং আম্মাজানও ছিলেন হাফিজা ও আবিদা।২
হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) এর সময়কাল পর্যালোচনায় আল্লামা সুয়ূতী, ইবনে জাওযী শিবলী নুমানী, সৈয়দ সুলায়মান নদভী প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ সে যুগের যে চিত্র তুলে ধরেছেন তার সারমর্ম হলো, তখন মুসলমানদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও চারিত্রিকসহ সর্বক্ষেত্রে এক নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিলো। সেই সংকটকালে গাউসুল আযম আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) তাঁর নিগুঢ় ইলম ও প্রবর আধ্যাত্মিক শক্তির বলে দ্বীনের তাজদীদি কর্মসূচীর মাধ্যমে মুহিউদ্দীন (দ্বীনের পূনর্জীবতকারী) উপাধিতে ভ‚ষিত হন। আধ্যাত্মিক জগতে তিনি গাউসুল আযম হিসেবে সুপরিচিতি। আমাদের দেশে তাঁকে বড় পীর হিসেবে ডাকার প্রচলন রয়েছে। বক্ষমান প্রবন্ধে বহুমাত্রিক প্রতিভায় অভিসক্ত এই মহান মনিষীর প্রবর্তিত কাদেরিয়া তরিকা স¤পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও শিক্ষক
হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) প্রথমে ইলমে তাসাওউফের তা’লীম গ্রহণ করেন বিখ্যাত সূফী হযরত আবুল খায়ের মুহাম্মদ হাম্মাদ আদ দাব্বাস (রহ.) এর কাছে। হযরত হাম্মাদ আদ দাব্বাস (রহ.) ৫২৩/২৫ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। এর আগ পর্যন্ত শায়খ জিলানী (রহ.) তাঁর সোহবত লাভ করেন। আবু ইয়াকুব ইউসুফ ইবনে আইয়ুব হামাদানী বলেন শায়খ সাম্মাদ দাব্বাসের তত্ত¡ বিশ্লেষণে এমন সব সুক্ষ তত্ত¡ থাকত, যার কারণে তিনি যুগের আউলিয়াদের উপর প্রাধান্য লাভ করেছিলেন। শায়খ হাম্মাদ (রহ.) শায়খ জিলানীর প্রতি উচ্চ ধারনা পোষন করতেন। শায়খ জিলানী যুবক থাকা অবস্থায় একদা শায়খ হাম্মাদ (রহ.) শায়খ জিলানী (রহ.) কে নিয়ে আলোচনায় বলেন – “আমি তাঁর মধ্যে ওলীত্বের দুটি লক্ষন দেখতে পেয়েছি এবং সেই লক্ষন বা চিহ্ন দুটি পাতালপুরী থেকে সর্বোচ্চ জগৎ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। আমি সর্বোচ্চ জগতের সিদ্দিকীনদের মধ্যে তাঁর বিষয়ে আলোচনা শুনেছি।” সেই সময়ে আরেকদিন শায়খ জিলানী (রহ.) শায়খ হাম্মাদ (রহ.) এর খেদমতে তাশরীফ আনলে শায়খ হাম্মাদ তাঁর সম্মানে দাড়িয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করে বললেন ” সুদৃঢ় ও সর্বোচ্চ পাহাড়কে স্বাগতম! যা কখনো টলবার নয়।”৩
পরবর্তীতে হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) আবু সাইদ মুবারক ইবনে আলি ইবনে হুসাইন আল মুখাররমী (রহ.) এর কাছ থেকে ফিকহ শিক্ষার পাশাপাশী তাসাওউফের তালিম, খিরকা ও খেলাফত প্রাপ্ত হন। আবু সাঈদ মুবারক মুখাররমী তাঁর যুগে ফিকহের একজন প্রখ্যাত ইমাম ছিলেন। তিনি হাম্বলী মাযহাব অনুসরণ করতেন। শায়খ আবদুল কাদির জিলানীর শিক্ষকদের মধ্যে তিনি ছিলেন তার মুর্শিদ বা পীর, আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। তিনি বলেন: “আমি শায়খ আবদুল কাদির জিলানিকে একটি পোশাকের খিরকা দিয়ে বিনিয়োগ করেছি এবং তিনিও আমাকে একটি পোশাক দিয়ে বিনিয়োগ করেছিলেন। আমরা একে অপরের কাছ থেকে উপকৃত হয়েছি ।৪
আধ্যাত্মিক স¤পর্কের ধারা
কাদেরিয়া তরিকার নিসবতে তিনটা ধারার সন্নিপাত ঘটে। যথা-
১। আখেরি নবী সায়্যিদুল মুরসালীন হযরত আহমাদ মুজতবা মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা), হযরত হাসান বসরী (রহ.), হযরত হাবিব আল-আজমি(রহ.), হযরত দাউদ তাঈ (রহ.), হযরত মারুফ কারখী (রহ.), হযরত সারি আস সাকতি (রহ.), হযরত জুনায়েদ আল-বাগদাদী (রহ.), হযরত আবু বকর শিবলী (রহ.), হযরত আবদুল আজিজ বিন হারস বিন আসাদ ইয়েমেনী তামিমি (রহ.), আবদুল ওয়াহিদ ইয়েমেনী তামিমি (রহ.), আবু আল-ফারাহ তারতুসী (রহ.), হযরত আবু আল-হাসান কুরাশি হাককারী (রহ.), হযরত আবু সাঈদ আল-মুবারক মুখাররমী (রহ.), হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)
২। কাদেরিয়া তরিকার দ্বিতীয় ধারা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে পর¤পরাগত ভাবে হযরত সালমান ফারসী রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু, হযরত কাসেম বিন মুহাম্মাদ (রহ.), হযরত জাফর সাদিক (রহ.) হয়ে হযরত মারুফ কারখী (রহ.) ও সররি সাকতি (রহ.) পর্যন্ত পৌঁছে। এমনিভাবে তা এগোতে এগোতে হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রহ.) পর্যন্ত এসে পৌঁছে। এখান থেকে হযরত শায়খ আবু বকর শিবলী (রহ.) লাভ করেন। তাঁর থেকে ক্রমধারায় শায়খ আবু ফযল আবদুল ওয়াহিদ ইয়েমেনী লাভ করেন। এমনিভাবে এই সিদ্দিকী নিসবত হযরত আবু সাঈদ আল-মুবারক মুখাররমী (রহ.) থেকে প্রাপ্ত হন শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)
৩। এছাড়া কাদেরিয়া তরিকার আরেকটি ধারা বা নিসবত হযরত খিজির (আ) এর সাথে স¤পৃক্ত। বংশীয় দিক থেকে থেকেও তিনি তিনি পিতা মাতা উভয় সুত্রে হযরত আলী (রা) এর সাথে স¤পৃক্ত এই সকল নিসবত একত্রভ‚ত হয়ে কাদেরিয়া তরিকার উন্মেষ ঘটে।৫
কাদেরিয়া তরিকার মূলনীতি
ইসলামের মূলধারার বাইরে কাদেরিয়া তরিকা কোন বিশেষ মতবাদ বা শিক্ষা গড়ে তোলেনি। এই তরিকার অনুসারীরা ইসলামের মৌলিক নীতিগুলিতে বিশ্বাস করে, কিন্তু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সেই নীতিগুলোকে ব্যাখ্যা করে। গবেষকগণ বলেন বড় পীর (রহ.) তাঁর মুরিদ, সালেক ও পুত্রদের যেসব বিষয়ে সবিশেষ গুরুত্বারোপ করে নির্দেশ দিতেন সেগুলোকেই কাদেরিয়া তরিকার মূলনীতি হিসেবে গণ্য করা হয়। কুর’আন ও সুন্নাহর অনুসরণই এই তরিকার মূলভিত্তি। আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) তাঁর পুত্র আব্দুর রাজ্জাক (রহ.) কে উদ্দেশ্য করে বলেন – “আমাদের এই (কাদেরিয়া) তরিকার মূলভিত্তি হলো কুর’আন ও সুন্নাহ। এভাবে প্রশান্ত হৃদয়, বদান্যতা, দান সাদাকা, অন্যকে কষ্ট না দেয়া, অন্যের দেয়া কষ্টকে সহ্য করা, সাথীদের ভ‚লত্রæটি ক্ষমা করা অন্যতম অঙ্গ।” তিনি আরো বলেন- “প্রত্যেকটি বিষয়কে কুর’আন সুন্নাহর সাথে মিলিয়ে দেখবে। যদি তা এই দুইয়ের সাথে সামান্যতম সাংঘর্ষিক হয় তবে তা তৎক্ষনাৎ বর্জন করবে।৬
কাদেরিয়া তরিকার পদ্ধতি
লতিফাঃ এই তরিকায় দশ লতিফার স্থান নির্ধারণ হয়েছে এই ভাবে : বাম স্তনের দুই আঙ্গুল নিচে লতিফায়ে কালব- মাকামে তাওবার ফয়েজ, ডান স্তনের দুই আঙ্গুল নিচে লতিফায়ে রূহ- মাকামে ইনাবাতের ফয়েজ, বুকের মধ্যস্থলে লতিফায়ে সির্র-মাকামে যুহদের ফয়েজ, পেশানী সিজদার স্থানে লতিফায়ে খফি- মাকামে অরার ফয়েজ, মাথার তালুতে লতিফায়ে আখফা- মাকামে শোকরের ফয়েজে, নাভিমূলে লতিফায়ে নফস- মাকামে তাওয়াক্কুলের ফয়েজ,এবং সমগ্র দেহে লতিফায়ে আব (পানি)- মাকামে কানায়াতের ফয়েজ, লতিফায়ে আতশ (আগুন)- মাকামে তাসলীমের ফয়েজ, লতিফায়ে খাক (মাটি)- মাকামে রেজার ফয়েজ, ও লতিফায়ে বাদ (বাতাস) – মাকামে সবরের ফয়েজ। এই দশ লতিফা একত্রে মুরাকাবাকে বলা হয় সুলতানুল আজকার। জিকির মুরাকাবা বা ওজিফা আদায়ের শুরুতে সালেকের সওয়াব রেসানী করে নিতে হয়। সাধারণত বেজোড় সংখ্যায় ইসতেগফার, সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস, এগারো বার দরূদ শরীফ পড়ে মুনাজাত করে উর্ধ্বতন মাশায়েখের উপর সওয়াব বকশীশ করতে হয়। ।
দরূদ শরীফ: এই তরিকার সালেকগণ এশা ও ফজর নামাজ বাদ চক্ষুদ্বয় বন্ধ করে নামাজে বসবার ন্যায় বসে এবং কালবের দিকে খেয়াল করে তরিকার নিয়মানুযায়ী নিয়ত করে দরূদ শরীফ পড়ে।
বাদ এশাঃ আল্লাহুম্মা সাল্লি আ’লা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন মা’দানিল জূদি ওয়াল কারামি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লিম। অর্থঃ আয় আল্লাহ! আপনি খাস রহমত নাজিল করুন আমাদের সরদার মুহাম্মাদ সাল্লালল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর যিনি সর্ব প্রকার দান ও বখশিসের খনি এবং (খাস রহমত নাজিল করুন) তাঁর আওলাদগণের উপর এবং সালাম (খাস শান্তি) নাজিল করুন (তাঁর ও তাঁর আওলাদগণের উপর)।
বাদ ফজরঃ আল্লাহুম্মা সাল্লি আ’লা সায়্যিদিনা মুহাম্মাদিন-সায়্যিদিল মুরসালীন। ওয়া আ’লা আরশাদি আওলাদিহিশ শাইখ আবদুল কাদির জিলানী ইমামিত ত্বারীকাতি ওয়াল আওলিয়াইল কামিলীন।
অর্থঃ আয় আল্লাহ তায়ালা! আপনি খাস রহমত নাজিল করুন আমাদের সরদার মুহাম্মাদ (সাঃ) এর উপর, যিনি সমস্ত পয়গম্বরগণের সরদার এবং তাঁর সমধিক সুপথ প্রাপ্ত বংশধর শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর উপর যিনি তরিকত ও কামেল পীরগণের ইমাম।
কাদেরিয়া তরিকার কিছু জিকির মুরাকাবা
১। নফি ইসবাত ( লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) ২। পাছ আনফাছ অর্থাৎ শ্বাস-প্রশ্বাসের জিকির। ৩। জরবী জিকির- (জরবী শব্দের অর্থ আঘাত করা। বিশেষ প্রক্রিয়ায় আল্লাহর নাম দ্বারা কলবের ওপর আঘাত করা হয়, যে কারণে একে জরবী জিকির বলে।) যথা-এক, দুই , তিন, ও চার জরবী জিকির। ৪। খফী জিকিরঃ আল্লাহু হাজেরী, আল্লাহু নাজেরী, আল্লাহু সামীয়ী, আল্লাহু বাছীরী, আল্লাহু মায়ী। ৫। ফানাফিল্লাহ মাকামের মোরাকাবা। ৬। বিশেষ বিশেষ আয়াতের মুরাকাবা।৭
বিশ্বে কাদেরিয়া তরিকার বিস্তার
কাদেরিয়া তরিকা প্রসারিত হয়েছে পৃথিবীর সর্বত্র। সারা পৃথিবীতে কাদেরিয়া তরিকার নিসবত বা সম্বন্ধ অনুযায়ী অসংখ্য খানকা শরীফ রয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশে প্রায় সবগুলো দেশে বিশেষ করে মিসর, লিবিয়া, সুদান, নাইজার, নাইজিরিয়া, মালী, তিউনিসিয়া, মরক্কো, মৌরিতানিয়া প্রভৃতি দেশে এই তরীকার ব্যাপক চর্চা রয়েছে। এশিয়া মহাদেশে এবং ইউরোপ ও আমেরিকাতেও এর চর্চা রয়েছে। গবেষক জামালুদ্দিন ফালেহ্ জিলানী তাঁর ‘ইমাম আবদুল কাদের জিলানী’ নামক কিতাবে লিখেছেন “সবচেয়ে প্রাচীনতম তরিকা হলো কাদেরিয়া তরিকা। এ তরিকার প্রবর্তকের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো তিনি এমন একটি প্রজন্ম গঠনে মহান ভ‚মিকা রেখেছেন যারা বাইতুল মুকাদ্দাস শরীফকে খ্রিস্টান দখলদারমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর এ কাদেরিয়া তরিকার অনুসারীদের অন্যতম ছিলেন বীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, আবদুল কাদের জাজায়েরী, ওমর মুখতার, জেনারেল আবদুর রহমান, রফিক আলী আল জিলানী সহ এ উম্মতের গৌরব করার মত আরও অনেকেই।” অধ্যাপক ড. হাসান ইব্রাহীম হাসান তাঁর রচিত ‘ইনতেশারুল ইসলাম ফিল ক্বাররাহ্ আল আফরিকীয়্যাহ্ গ্রন্থে বলেন- ‘আফ্রিকা মহাদেশে ইসলাম প্রচারে যে তরিকার অবদান সবচেয়ে বেশি তা হলো তরীকায়ে কাদেরিয়া। অনুরূপভাবে ড. আবদুর রহমান জাকী তাঁর রচিত ‘আল মুসলিমুনা ফি আল আলাম আল ইয়াউম’ নামক কিতাবে একই মন্তব্য করেন। মাসিক আল ইসলাম ওয়াত তাসাউফ (জানুয়ারি ১৯৬১) তার রিপোর্টে উল্লেখ করেছে সোমালিয়াতে সর্বপ্রথম যে তরিকাটি প্রবেশ করে সেটি হলো কাদেরিয়া তরিকা।
ফরাসী প্রাচ্য গবেষক ফানসান মুনতাই ১৯৫৭ সালের ১৩ জানুয়ারি মরক্কোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে লিখিত প্রবন্ধে বলেন, ‘চীনের ইনান নামক প্রদেশে একটি মাজার দেখা যায় যার ফলকে লিখা আছে। আবদুর রাজ্জাক বাগদাদির নাম, যিনি দ্বাদশ খ্রিস্টীয় শতাব্দীতে চীনে ইন্তেকাল করেন। যিনি ছিলেন হযরত আবদুল কাদিরর জিলানী (রহ.) এর পৌত্র (নাতী) এবং চীনে ইসলাম প্রচারকারীদের মধ্যে অগ্রগণ্য হেলী কারবার দানকোচ বলেন- “সোভিয়েত ইউনিয়নের কোকাজের মুসলমানগণ এখনও হানাফী মাযহাব এবং কাদেরিয়া তরিকার অনুসারী-কমিউনিজমের শাসন ক্ষমতা সত্তে¡ও তাঁদেরকে তাঁদের ঘরে কাদেরিয়া তরিকার ওয়াজিফা পাঠ করতে শুনেছি”৮
উপমহাদেশ ও বাংলাদেশে কাদেরিয়া তরিকার বিস্তার ও চর্চাঃ
উপমহাদেশে কাদেরিয়া তরিকার প্রচারকদের মধ্যে সুলতান বাহু (রহ.), শায়খ আব্দুর রহমান জিলানী দেহলভী (রহ.), শাহ কামাল কায়থেলী (রহ.), হযরত মনসূর বাগদাদী (রহ.), বাবা আদম শহীদ (রহ.), শায়খ মাখদুম রুপোশ ও হযরত শাহ জালাল ইয়েমেনী (রহ.) এর সফরসংগী হিসেবে আগত কাদেরিয়া তরিকার সুফিগণ এই তরীকার ব্যাপক প্রসার ঘটান। বাবা আদম শহীদ রহ. ১১৪২ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম প্রচারে উদ্দেশ্যে ১২ জন আরবীয় নাগরিক নিয়ে বাণিজ্য জাহাজ যোগে চট্টগ্রাম পৌঁছান। তিনি প্রথমে মহাস্থানগড়ে খানকায়ে কাদেরিয়া স্থাপন করে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। রাজশাহীতে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে যাদের নাম ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে হযরত শাহ মাখদুম রূপোশ (রহ.) তাঁদের অন্যতম। ইসলামী বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, ‘তাঁর নাম সায়্যিদ আবদুল কুদ্দুস। শাহ মাখদুম রূপোশ নামে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। ‘শাহ মাখদুম রূপোশ এগুলো তাঁর লকব বা উপাধি। তাঁর পিতার নাম হযরত আযাল্লাহ্ শাহ (রহ.)। হযরত আযাল্লাহ শাহ (রহ.) ছিলেন হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) অন্যতম পুত্র। হযরত শাহ মাখদুম রূপোশ ছিলেন আযাল্লাহ শাহ (রহ.) দ্বিতীয় পুত্র।৯ নিকটকালে মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী (রহ.) ও ফুরফুরা শরীফের পীর মুজাদ্দিদে যামান আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.) অন্যান্য তরিকার পাশাপাশী কাদেরিয়া তরিকার সবক ও তালিম প্রদানে গুরুত্ব প্রদান করতেন। তাঁদের খলিফাগণও সেই নীতি গ্রহণ করে অত্র অঞ্চলে কাদেরিয়া তরিকার প্রচার প্রসারে ব্যাপক অবদান রাখেন।১০
গাউসুল আযম হযরত আবদুল কাদির জিলানী হিজরী ৫৬০-৬১ সালের ১১ রবিউস সানী ৯০-৯১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। কাদেরিয়া তরিকার সালেকগণ প্রতি আরবী মাসের এগারো তারিখ গেয়ারভী শরীফ ও খতমে গাউসিয়া আদায় করেন এবং ১১ রবিউস সানী (ফাতিহা-ই-ইয়াযদহম) বাংলাদেশে রাষ্ট্র্রীয়ভাবে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয়।
তথ্যসূত্র
১। প্রফেসর ড. আবুল বয়ান মুহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান, তাসাউফ তরিকত উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, ঐতিহ্য, ২০১৮ , পৃঃ, ৩৭।
২। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ইসলাম প্রসঙ্গ, মাওলা ব্রাদাস, ২য় মুদ্রণ, ২০০৬, পৃঃ ৮২।
৩। মাওলানা শাব্বীর আহমদ মোমতাজী, বড় পীর শায়েখ আবদুল কাদের জিলানী (র), ডিসেম্বর, ২০১৭, পৃঃ ৮৬।
৪। ঞযব ঝঁষঃধহ ড়ভ ঃযব ংধরহঃং: গুংঃরপধষ খরভব ধহফ ঞবধপযরহম ড়ভ ঝযধরশয ঝুবফ অনফঁষ ছধফরৎ ঔরষধহর, গঁḥধসসধফ জরুধু ছধফৎর, অফধস চঁনষরংযবৎং ্ উরংঃৎরনঁঃড়ৎং, ২০০৭, চধমব: ৮৭.
৫। মাওলানা রফিকুল ইসলাম, বড়পীর হযরত আবদুল কাদের
জিলানী (র) জীবনী ও কারামত, ঢাকাঃ বেগম বুক হাউস, জুন ২০১২, পৃঃ ৯৮-৯৯, তা’লীমে তাসাওউফ, অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ুম, আঞ্জুমানে তোয়াজিয়া, ২০১৫, পৃঃ ১৬-১৭।
৬। ড. সাঈদ আল কাহতানী, আশ শাইখ আবদুল কাদির জিলানী, ১ম সংস্করণ, ১৯৯৭, পৃঃ ৬৩৪, ৬৩৯, মাওলানা শাব্বীর আহমদ মোমতাজী, প্রাগুক্ত,পৃঃ ১২৪।
৭। সেরাজুস সালেকীন, মাওলানা আবদুল খালেক, ছতুরা শরীফ, মুদ্রণ ২০১২, পৃঃ ২৭৮-২৯৮।
৮। নূর মোহাম্মদ মিলু, ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম, াড়নড়মযঁৎবশড়ঃযধ.পড়স ৯। মোঃ আবুল, কাসেম, শাহ মখদুম রূপোশ -যুগ মানস (২য় সংস্করণ), শাহ মখদুম রূপোশ দরগা এস্টেট, রাজশাহী, পৃষ্ঠা ১৭১।
১০। কাদেরিয়া তরিকা, অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ুম, দৈনিক জনকন্ঠ, জানুয়ারী ০৬, ২০১৭ ।

মাসুক আহমেদ
+ posts

মাসুক আহমেদ একজন সুফি ধারার কবি, সুফি গবেষক ও লেখক। নিজের সাথে দেখা তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। তিনি সওতুল মদীনা পত্রিকার উপ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তারিফ পত্রিকার সম্পাদক ও সেন্টার ফর সুফি স্টাডিজ এন্ড রিসার্চ এর ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে বোস্তানুল বোরহান: সূফি ইমাম শায়খ বোরহানুদ্দীন র. জীবনকথা, রসূলে নুমা: সূফি ফতেহ আলী ওয়াইছী র. ইশকে রসূলের অমর সত্তা, মর্দে মুজাহিদ: সূফি নূর মুহাম্মাদ নিজামপুরী র. জীবনকথা , শায়খ মানযূর আহমাদ: জীবন ও কর্ম, মুজাদ্দিদে জামান আবু বকর সিদ্দিকী: জীবন, দর্শন, তাজদীদ। এছাড়াও তিনি প্রফেসর ড. এম শমশের আলী রচিত  বিজ্ঞান সূফি দর্শন ও রুমী বঙ্গানুবাদ এবং সায়্যিদ আহমাদ শহীদ বেরলভী (রহ.) স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top