
এখন আমরা একবিংশ শতাব্দীর জাহেলী যুগে বাস করছি। এ যুগে বহু লোক তাসাউফকে অস্বীকার করছে। এটা তাদের অজ্ঞতাবশত হোক অথবা তাসাউফ তথা আধ্যাত্মিকতা চর্চার সাথে বৈরিতার কারণে হোক। কিন্তু আমাদের আলিমগণ ইলমে তাসাউফের অতি মূল্যায়ন করতেন।
আমরা আলিমগণকে দেখতে পাই, তাঁরা ইলমকে মূলত তিনভাগে ভাগ করেছেন :
(১) একদল শুধু ইলমুল আকাঈদ নিয়ে ব্যস্ত। তাঁরা অন্য ইলমের প্রতি ভ্রæক্ষেপ করেন না।
(২) দ্বিতীয় দল ইলমুল ফিকহ নিয়েই ব্যস্ত। অন্যান্য বিষয়ের প্রতি তাঁদের লক্ষ নেই।
(৩) তৃতীয় দল শুধু ইলমুত তাসাউফ নিয়ে ব্যস্ত। অন্যান্য ইলম চর্চার সময় তাদের নেই। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম এ তিন ইলমকেই শামিল করে।
ইসলামি শরিয়াতের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো : প্রথমত আক্বীদাকে শুদ্ধ করতে হবে এবং শিরক বর্জন করতে হবে। এ ছাড়া সকল প্রকার বিদআত ত্যাগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত ইলমুল আখলাক, যা নফসকে অসৎকর্ম থেকে দূরে রাখে এবং সৎকাজে প্রলুদ্ধ করে। সর্বশেষে নফস পবিত্র আত্মায় পরিণত হয়। এটাই হলো ইলমুত তাসাউফ। তৃতীয়ত ইলমুল ফিকহ্, যা হলো আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার এবং বান্দাদের পরস্পরের বিধিবিধানসমূহ।
তাসাউফের আভিধানিক অর্থ
“তাসাউফ শব্দের উৎপত্তি আরবি সউফ (صَوْف) হতে। ‘সওফ’ শব্দের বাংলা অর্থ পশম। সুফীগণের পূর্বসূরিগণ পশমি লেবাস পরিধান করতেন বলে এই নাম। ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে,
لَقَدْ سَلَكَ فَجَّ الرَّوْحَاءَ سَبْعُونَ نَبِيًّا حُجَّاجًا عَلَيْهِمْ ثِيَابُ الصُّوفِ وَلَقَدْ صَلَّى فِي مَسْجِدِ الْخَيْفِ سَبْعُونَ نَبِيًّا
“সত্তর জন নবী হজ করার জন্য ফাজ্জার রাওহা নামক স্থানটি অতিক্রম করে গেছেন এবং মসজিদে খায়ফেও ৭০ জন নবী নামাজ পড়েছেন।”
অনুরূপ প্রখ্যাত তাবেই মুজাহিদ বলেছেন,
صَلّي فِي هَذا المَسْجِدِ مَسْجِدِ الخَيْفِ يَعْنِي مَسْجِد مِنى سَبْعُونَ نَبِيّا لِبَاسُهُم الصُّوفُ ونِعَالُهم الخُوص
“এই মসজিদে খায়ফ অর্থাৎ মিনার মসজিদে সত্তরজন নবী নামায পড়েছেন, তাদের প্রত্যেকের পশমী পোষাক ও খেজুর পাতার জুতো ছিল।”
কারও মতে, সুফী শব্দের উৎপত্তি আসহাব-ই-সুফফাহ (أصْحَابُ الصُّفَّة) থেকে হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় একদল সাহাবি তাদের পরিবার পরিজন ছেড়ে মসজিদে নববীর এককোণে বসে শুধু আল্লাহর ইবাদত ও দ্বীনি ইলম চর্চায় লিপ্ত থাকতেন। সুফীগণের আমলের সাথে তাদের বেশ মিল রয়েছে। ফলে তারা সুফী নামে খ্যাত হন।
আবার কেউ কেউ বলেন, তাসাউফ পন্থীদের এ জন্য সুফী বলা হয় কেননা তাঁরা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের বেলায় প্রথম সারিতেই রয়েছেন। আরবিতে সফ(صَف) শব্দের বাংলা মানে হলো সারি। সুফীগণ নেক কাজের বেলায় অন্যান্যদের তুলনায় প্রথম সারিতে বলে তাদের সুফী বলা হয়।
কেউ বলেন, ‘সুফী” শব্দের উৎপত্তি আরবি সুফী শব্দ থেকে (صوفي) হয়েছে। যার অর্থ হলো পছন্দনীয়। তাসাউফ ও তরিকতপন্থীগণ আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দাহ তাই তাদেরকে সুফী বলা হয়।
কারো কারো ধারণা “সুফী” শব্দটি গ্রীক শব্দ ঝড়ঢ়যরধ থেকে উদ্ভুত, যার অর্থ প্রজ্ঞা। সেক্ষেত্রে সুফী অর্থ প্রজ্ঞা বা হিকমাতের প্রেমিক বা অনুসারী। অনুুরূপভাবে সুফীগণও প্রজ্ঞা বা হিকমাত অন্বেষণে ব্যস্ত থাকেন।
কারও মতে, সওফা বিন বিশর ইবন উদ ইবন তানিহা’র সাথে সংযুক্ত করে সুফীদের সুফি বলা হয়। এই গোত্রটি প্রাচীনকাল থেকে মক্কায় বসবাস করতো। এই গোত্রে অনেক দুনিয়াবিমুখ ও ইবাদতগুযার লোক ছিলেন। তারপর থেকে পরকালের যাত্রী আবেদ মাত্রকেই সুফী বলা হয়ে থাকে।
প্রাচ্যবিদ আর এ নিকলসন তাসাউফ শব্দের উৎপত্তি নিয়ে বারোটি অভিমত পেশ করেছেন। তাঁর মতে তাসাউফ শব্দের উদ্ভব সউফ (صَوْف) বা সাফা(صَفاء) থেকে হয়েছে।
আবু নাসর আস সাররাজ আত তুসি (মৃ. ৩৭৮ হি:) ‘আল লুমা ফিত তাসাওউফ’ নামক গ্রন্থে বলেন :
ان العبد اذا تحقق بالعبودية وصافاه الحق حتى صفا من كدر البشرية نزل منازل الحقيقة وقارن أحكام الشريعة، فإذا فعل ذلك فهو صوفي
“বান্দা যখন দাসত্বে একনিষ্ঠ হয় এবং আল্লাহ তাকে পরিশুদ্ধ করেন এমনকি সে মানবীয় কদর্যতা থেকে পরিশুদ্ধ হয়ে হাকিকতের বিভিন্ন অবস্থানে উপনীত হয় এবং শরয়ী বিধিবিধানের সাথে সম্পৃক্ত থাকে- সে যদি এমন করে, তবে সে সুফি।” আমাদের মতে সুফী শব্দের উৎপত্তি ‘আসহাব ই সুফফাহ’ থেকে। কারণ বর্তমান যুগের সুফীদের চালচলন ও আদব-আখলাক সম্পূর্ণ আসহাব ই সুফফাহর ন্যায়।
তাসাউফের পারিভাষিক অর্থ
১. মুহিব্বুল্লাহ বিহারি বলেন : তাসাউফ এমন একটি ইলম, যা মানুষের কলব বা অন্তরাত্মা নিয়ে আলোচনা করে এবং কলবের আবেগ ও অনুভূতি সম্পর্কে বর্ণনা দেয়।
২. ইবনু আবেদীন ‘রাদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার’ গ্রন্থে বলেন : ইলমুল আখলাক (তাসাউফ) হলো এমন একটি ইলম, যা দ্বারা মানুষ ফজিলত বা কল্যাণকর কাজ ও তা অর্জনের বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হতে পারে এবং অন্যায় ও অকল্যাণকর কার্য ও তার উপকরণ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করতে পারে।
৩. ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী বলেন :
تَجْرِيد الْقلب لله تَعَالَى واحتقار مَا سواهُ
‘ইলমুত তাসাউফ এর অর্থ আল্লাহর জন্য হৃদয়কে শূন্য করা এবং তাঁকে ছাড়া সবকিছু তুচ্ছ জ্ঞান করা।’
৪. আল্লামা মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আল ফাসী বলেন : ‘তাসাউফের হলো কলবকে আল্লাহর জন্য উজাড় করে দেয়া এবং অন্যের চিন্তা থেকে সেটাকে মুক্ত রাখা।’
৫. ইমাম মালেক বলেন : যে ব্যক্তি শুধু ফিকহ-এর ইলম শিখল কিন্তু তাসাউফ হাসিল করল না, সে ফাসিক। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি শুধু তাসাউফের ইলম হাসিল করল কিন্তু ফিকহ শিখল না, সে ধর্মদ্রোহী। কিন্তু যে এ উভয় বিষয়ের ইলম লাভ করল, সে যথার্থ কাজই করল।
৬. আবু তালিব আল-মক্কী বলেন : ইলমুল ফিকহ ও ইলমুত তাসাউফ এমন দুটি ইলম, যার একটি থেকে অন্যটি আলাদা নয় বরং অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যেমন : ইমান ও ইসলাম। ইমান ও ইসলাম একের সাথে সাথে অন্যটি এমনভাবে জড়িত যেমন মানুষের শরীর ও আত্মা। এর একটি হতে অন্যটি আলাদা হতে পারে না।
৭. ইমাম মোল্লা আলী ক্কারী বলেন : ইলমে বাতেন হাসিল করতে হলে, ইলমে জাহের শিখতে হবে। আর ইলমে জাহেরও পূর্ণাঙ্গভাবে শিখা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না বাতেন বা অন্তরাত্মাকে শুদ্ধ করা যায়।
৮. ইমাম আবু হানীফা র. বলেন,
الْفِقْهُ مَعْرِفَةُ النَّفْسِ مَا لَهَا وَمَا عَلَيْهَا
“ফিকহ হল নফস-এর পরিচয় লাভ করা এবং নফসের মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয় দিকের সম্যক জ্ঞান লাভ করা।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ইলমে তাসাউফ ও ইলমে আকাইদ একই জিনিস। প্রাথমিক যুগে তাসাউফ ও আকাইদকে একই প্রকার ইলম হিসেবে গণ্য করা হতো। পরবর্তীকালে এটা দুটি ভিন্ন ভিন্ন নাম পরিগ্রহ করে।
মুসাল্লামুস সুবুত এর প্রান্তটীকায় লেখা আছে: ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে ইলমুল ফিকহ বলতে শরিয়াতি আহকাম, ইলমুল আকাইদ বলতে ইলমুল ইলাহীয়াত বা আল্লাহ সম্পর্কিত আকীদাগত জ্ঞান আর তাসাউফ বলতে হাকীকাত, আখলাক, চরিত্র ও আচারণবিধি সম্পর্কিত জ্ঞান বোঝায়।
৯. জুনাইদ বাগদাদী বলেন : তাসাউফের অর্থ হলো, তুমি সর্বদা আল্লাহর সাথে থাকবে।
১০. জুরায়রী বলেন: তাসাউফের অর্থ হলো, আধ্যাত্মিক অবস্থাসমূহ পর্যবেক্ষণ করা এবং সবসময় (শরঈ) শিষ্ঠাচার বজায় রাখা।
১১. জুনাইদ বাগদাদী আরও বলেন : তাসাউফের মানে হলো, হক তোমার থেকে সকল প্রকার কুকর্মকে মেরে ফেলবে এবং সত্যের জন্যই তুমি বেঁচে থাকবে।
১২. সুমনুন বলেন : তাসউফের অর্থ হলো তুমি কিছুর মালিক নও এবং তোমার উপরও কারো মালিকানা না চলে।
১৩. রুওয়াইম এর মতে তাসাউফ হলো আল্লাহর জন্য নিজেকে ছেড়ে দেয়া। তিনি যা ইচ্ছা তা-ই করবেন।
১৪. মারুফ আল কারখী বলেন : তাসাউফ বলতে বুঝায় হাকীকত গ্রহণ এবং মাখলুকের হাতের সমুদয় বস্তুর আশা ত্যাগ করা।
১৫. জুনাইদ বলেন : তাসাউফ পন্থীরা হলেন মাটির ন্যায়, যার উপর সকল প্রকার ময়লা কদর্য ফেলা হয়। কিন্তু তা হতে সর্বদা মঙ্গলজনক জিনিসই বের হয়ে।
১৬. জুন্নুন আল-মিসরী বলেন : সুফীগণ হলেন ঐ সকল লোক যাঁরা শুধু আল্লাহকেই পছন্দ করেছেন। ফলে আল্লাহও তাদেরকে মনোনীত করেছেন।
১৭. ইমাম গাজ্জালী আল মুনকিয মিনাদ দালাল গ্রন্থে বলেন : ইলম ও আমল উভয় দ্বারাই তরিকত ও সুফীবাদের পূর্ণতা সম্ভব। ফলে মানুষের কলব বা অন্তঃকরণে আল্লাহর জিকর ছাড়া অন্য কিছু থাকবে না।
১৮. ইবনু খালদুন বলেন : তাসাউফ হলো শুধু আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হওয়া ও দুনিয়ার প্রতি বিরাগভাজন হওয়া। এ তাসাউফের বহিঃপ্রকাশ সাহাবী ও তাবেঈনের যুগে ঘটেছিল। কারণ সে যুগে আবেদগণ সুফী নামে খ্যাতি লাভ করে।
অধ্যাপক ড. আবুল বায়ান মুহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান (রহ.)
অধ্যাপক ড. আবুল বায়ান মুহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান (রহ.) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তিনি সওতুল মদীনার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ছিলেন। ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সভাপতির দায়িত্বপালনরত অবস্থায় তিনি ২০০৬ সালে ইন্তিকাল করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে তাসাউফ-তরিকত উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, কারামাতুল আউলিয়া, তাওয়াসসুল ওয়াসিলা, পরকাল দর্শন ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

