
[এই লেখাটি শহিদে মিহরাব ড. সাঈদ রামাদান আল বুতির ফিকহুস সিরাহ গ্রন্থের একটি অংশের অনুবাদ। আধুনিক সমাজের প্রেক্ষাপটে বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঠকবৃন্দ সহজেই বইটির আরবি, ইংরেজি, উর্দু ও ফরাসি সংস্করণ অনলাইনে পেতে পারেন।- সম্পাদক]
রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন চল্লিশ ছুঁই ছুঁই, তখন সময়ে সময়ে নিঃসঙ্গতা তাঁর কাছে প্রিয় হয়ে উঠলো। হেরার একটি গুহায় নির্জনবাসকে তাঁর কাছে আল্লাহ প্রিয় করে দিলেন। মক্কার উত্তর-পশ্চিমের একটি পাহাড়ের নাম হেরা। তিনি সেখানেই একাকী থাকতেন। একাধারে ইবাদত করতেন রাতের পর রাত ধরে। কখনও দশ আবার কখনও বাড়াতে বাড়াতে এক মাস পর্যন্ত। এরপর ফের বাসায় ফিরতেন। কিন্তু সেখানেও অল্প সময় থেকে আবারও নতুনভাবে আরেকটি নির্জনবাসের রসদপত্র নিয়ে ফিরে আসতেন হেরার গুহায়। এভাবেই চলছিল। একসময়, এমনি এক নির্জনবাসে তাঁর কাছে ওহি চলে আসলো।
শিক্ষা ও উপদেশ
[মানবজাতির উদ্দেশে] প্রেরণের আগে রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনে নির্জনবাসের এই যে আগ্রহ জন্মেছিল, এর মধ্যে বিরাট নিদর্শন আছে। সাধরণভাবে প্রতিটি মুসলিমের জীবনেই এই নির্জনবাসের বিরাট গুরুত্ব থাকলেও আল্লাহর দিকে দাওয়াতকারীদের জীবনে আছে বিশেষভাবে।
এতে স্পষ্ট বুঝা যায়, একজন মুসলিমের যতই ভালো গুণ থাকুক, সে যতই ইবাদতগুযার হোক, তার সাথে যদি নির্জনবাসের, নিঃসঙ্গতার কিছুটা সময় যদি যুক্ত না হয়, তবে তার মুসলমানিত্ব পরিপূর্ণ নয়। এই সময়টুকুতে সে আত্মপর্যালোচনা (মুহাসাবা) করবে, আল্লাহ তায়ালার মুরাকাবা করবে, চিন্তা করবে আল্লাহর মহত্বের প্রকাশবাহী বিশ্বজগতকে নিয়ে।
নিজের জন্য বিশুদ্ধ ইসলামের আকাক্সক্ষী- এমন প্রত্যেক মুসলিমের জন্যই এটা প্রযোজ্য। তাহলে যে নিজেকে দাঈ ইলাল্লাহ, সত্যপথের মুর্শিদ হিসেবে দেখতে চায়, তার ক্ষেত্রে কেমন হওয়া উচিত?
নির্জনবাসের হিকমত হলো, আমাদের নফসের অনেক বিপদাপদ আছে। নফসের এসব অনিষ্ট থেকে মুক্তির দাওয়াই হলো মানবসঙ্গ ত্যাগ করা আর দুনিয়ার উপস্থিতি আর শোরগোলের ভীড় এড়িয়ে নির্জনে আত্মপর্যালোচনা করা। অহঙ্কার, আত্মগর্ব, হিংসা, বকধার্মিকতা, দুনিয়ার লালসা- এগুলো সবই নফসের একেকটা আপদ। এগুলো নফসের উপর জেঁকে বসে এমনকি অন্তরের গভীরে পৌঁছে যায়। এরপর সেই মানুষটি নানা ধরনের ভালো কাজ আর ইবাদতে বাহ্যিকভাবে ভূষিত হলেও, লোকদের মধ্যে দাওয়াতি, হিদায়েতের কাজ এবং ওয়াজ-নসিহত করলেও ঐ বিষয়গুলো তার ভেতরে বিধ্বংসী কাজ চালাতে থাকে। এমন মানুষের একমাত্র ওষুধ সময়ে সময়ে নিজের সাথে একাকী থাকা। উদ্দেশ্য হলো নিজ নফসের বাস্তবতা ও উৎপত্তি নিয়ে চিন্তা করা, গভীরভাবে ভাবা জীবনের প্রতিটি ক্ষণে আল্লাহ তায়ালার প্রদত্ত সাহায্য-সহযোগিতা আর তাওফিকের প্রতি নিজের তীব্রতম প্রয়োজনের কথা। এরপর ভাববে সাধারণ মানুষের কথা। মহান ¯্রষ্টার সামনে তারা কতই না দূর্বল। চিন্তা করবে তাদের প্রশংসা বা নিন্দা- সবই কতটা নিরর্থক। ভাববে আল্লাহ তায়ালার মহত্বের প্রকাশগুলো নিয়ে; আখিরাত, শেষ বিচারের দিন আর এর ব্যাপ্তি নিয়ে, আল্লাহ তায়ালার রহমতের বিপুলতা আর শাস্তির ভয়াবহতা নিয়ে। এভাবে বারবার দীর্ঘসময় নিয়ে চিন্তা করলে নফসের সাথে সংশ্লিষ্ট ঐ বিপদাপদগুলো চলে যাবে; কলব তখন ইরফান আর পরিশুদ্ধিতার নূরে জীবন লাভ করবে। ঐ কলবের আয়নাকে দুনিয়ার মরিচা আর কলুষিত করতে পারবে না।
আরেকটি জিনিস আমভাবে মুসলিমদের জীবনে এবং খাসভাবে দায়ীদের জীবনে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হলো কলবে আল্লাহ তায়ালার মহব্বত লালন করা। এটাই সমস্ত কুরবানি আর জিহাদের উৎস, সমস্ত বিশুদ্ধ ও শক্তিশালী দাওয়াতের মূল ভিত্তি। আল্লাহ তায়ালার প্রতি এই মহব্বত শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক ঈমান বা বিশ্বাসের মাধ্যমে আসবে না। তাছাড়া বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়গুলো এককভাবে কখনই অন্তর আর অনুভূতির উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। যদি তাই হতো, তাহলে প্রাচ্যবিদরাই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (স.) উপর বিশ্বাসীদের একদম সামনের কাতারে থাকতো, তাদের অন্তরেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মহব্বত সবচেয়ে বেশি থাকতো। কখনও কি এমন শুনেছেন যে, একজন বিজ্ঞানী গাণিতিক একটা সূত্র কিংবা এ্যালজেবরার একটা ফর্মুলায় বিশ্বাস করে আত্মত্যাগ করেছে?
ঈমান আনার পরে আল্লাহ তায়ালার মহব্বত আনার উপায় হলো তাঁর অনুগ্রহ আর নেয়ামতগুলো নিয়ে বেশি বেশি চিন্তা করা, তাঁর সর্বোচ্চ মহত্ব ও আজমত নিয়ে ভাবা। এরপর মুখে ও কলবে- দুভাবে বেশি বেশি আল্লাহ তায়ালার যিকর করা। এগুলো কেবল ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বারবার নির্জনবাস, নিঃসঙ্গতা অবলম্বন, পার্থিব শোরগোল আর ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকার মাধ্যমেই হতে পারে।
একজন মুসলমান যখন এই ওয়াযিফা আদায়ে সচেষ্ট হবে, এটা যখন তার জন্য সহজ হয়ে যাবে, তখন তার ভেতরে এমন তীব্র ঐশী প্রেম উৎপন্ন হবে যে, সেজন্য বড় বড় সব কিছুকে তুচ্ছ, সমস্ত আকর্ষণীয় বস্তুকে হীন আর সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণাকে ক্ষীণ মনে হবে। সকল লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আর ঠাট্টা-বিদ্রæপের সামনেও তিনি থাকবেন বিজয়ের প্রত্যাশী । এই বিষয়গুলো অনেক বড় বড় পাথেয়। আল্লাহর পথে আহŸানকারীকে এগুলোকেই হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাতে দাওয়াতে ইসলামির দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেজন্য আল্লাহ তাঁকে যা কিছু দিয়ে প্রস্তুত করেছিলেন, এগুলোই হলো সেসব পাথেয়।
এর কারণ হলো, অন্তরের অভ্যন্তরীন উদ্দীপকগুলো যেমন ভীতি, ভালোবাসা, আশা ইত্যাদি যা করে ফেলে, নিছক বৃদ্ধিবৃত্তিক বুঝ তা করতে পারে না। ইমাম শাতেবি খুব ভালো বলেছেন। তিনি দু’ধরনের উদ্দীপকের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। একটি হলো আম মুসলিমদের উদ্দীপক। তাঁরা সাধারণভাবে ইসলাম গ্রহণের উদ্দীপনা থেকে শরঈ বাধ্যবাধকতা গ্রহণ করেছেন। আরেকটি হলো খাস মুসলিমদের উদ্দীপক। তাঁদেরকে যে উদ্দীপক শরঈ বাধ্যবাধকতা পালনে অনুপ্রাণিত করেছে, সেটা নিছক উপলব্ধি আর বোঝার চেয়ে বেশি কিছু। তিনি বলেন,
‘প্রথম জন ইসলামের বিধান অনুসারে, ঈমানের চাহিদানুসারে কোন অতিরিক্ত ছাড়া আমল করেন। এটা হলো তার অবস্থা। অন্য দিকে দ্বিতীয় জনের অবস্থা হলো, তিনি আমল করেন ভীতি, আশা অথবা ভালোবাসার প্রবাল্যের জন্য। ভীতি এক তাড়িয়ে নেয়া চাবুক, আশা [গান গেয়ে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া উটের] চালক আর ভালোবাসা ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া ¯্রােতের মতো। যার ভয় আছে, সে কষ্ট হবার পরও আমল করে। এর থেকেও যেটা কঠিন, সেটার ভয়ই তাকে বর্তমানে যেটা তুলনামূলকভাবে সহনশীল, সেটার উপর ধৈর্য ধরতে বাধ্য করে- যদিও এ কাজটাও কষ্টকর। একইভাবে আশা পোষণকারীও কষ্ট হবার পরও আমল করে। তার অবস্থা হলো, পরিপূর্ণ প্রশান্তি লাভের আশা তাকে সব কষ্ট করতে বাধ্য করে। কিন্তু যিনি প্রেমিক, তিনি কেবল প্রেমাষ্পদের আকাক্সক্ষায় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করে আমল করেন। নিতান্ত কঠিন কাজও তার জন্য সহজ হয়ে যায়, দূরতম জিনিসও অতি কাছের হয়ে যায়। তার সমস্ত শক্তি-সামর্থ্য নিঃশেষ হয়ে যায়। এরপরও তার মনে হয় না- ভালোবাসার শর্ত পূর্ণ হয়েছে কিংবা নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা যথাযথভাবে আদায় করা গেছে।’*
অভ্যন্তরীন উদ্দীপকগুলো হৃদয়ে (কলব) অর্জিত হবার জন্য নানামুখি মাধ্যম গ্রহণ করা হয়। এর প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে মুসলমানরা সবাই একমত। এগুলোকেই জমহুর ওলামা ও গবেষকদের কেউ নাম দিয়েছেন তাসাউউফ, কেউ দিয়েছেন ইহসান আবার ইমাম ইবন তায়মিয়া রাহিমাহুল্লাহু তায়ালার মতো কেউ এর নাম দিয়েছেন ইলমুস সুলুক।**
রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম [ওহি নিয়ে] প্রেরণের আগে যে নির্জনবাস অনুশীলন করেছিলেন, তা আসলে ঐসব উদ্দীপক অর্জনের জন্যই ছিল।
যাই হোক, কেউ কেউ যেভাবে আলাদা হয়ে গিয়েছে, তাদের মতো করে খুলওয়াত বা নির্জনবাসের অর্থ নেয়া ঠিক নয়। আলাদাভাবে তারা যেটা বুঝেছে, তা হলো মনুষ্যসমাজ থেকে পুরোপুরি বিমুখ হয়ে গুহা আর পাহাড়ে বসতি বানানো এবং এটাকেই বিশেষ মর্যাদার বিষয় মনে করা। এটা রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিদের আদর্শের বিপরীত। আসলে উদ্দেশ্য হলো আমরা যেমন অবস্থার কথা বলেছি, তা সংশোধনের জন্য দাওয়াই হিসেবে নির্জনবাসকে পছন্দ করা। দাওয়াই নিতে হয় পরিমাণমতো, একান্ত প্রয়োজনের সময়। নতুবা এটাই আরেকটা ভিন্ন রোগে পরিণত হবে, যা থেকে আত্মরক্ষা করা দরকার। সারাক্ষণ ধরে নির্জনবাসেই ছিলেন, লোকদের কাছ থেকে দূরে ছিলেন, নেককার কারও জীবনীতে যদি এমন দেখতে পান, তবে সেটা তাঁর নিজের বিশেষ কোন অবস্থার দরুন; সাধারণ মানুষের জন্য এটা দলিল নয়।
*ইমাম শাতেবির আল মুয়াফাকাত ২/১৪১; এছাড়া দেখুন এই লেখকের আরেকটি বই ‘দাওয়াবিতুল মাসলাহা ফিশ শারিয়াতিল ইসলামিয়্যাহ’ এর ১১১ থেকে ১১২ পৃষ্ঠা।
** দেখুন ইবন তায়মিয়ার মাজমুউল ফাতাওয়ার দশম খণ্ড
ড. সাঈদ রমাদান আল বুতী
ড. মুহাম্মদ সাঈদ রমাদান আল-বুতি (১৯২৯–২০১৩) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি পণ্ডিত ও সুফি গবেষক। সিরিয়ার দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া অনুষদের দীর্ঘদিনের অধ্যাপক ও ডিন হিসেবে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল অতুলনীয়। তাঁর রচিত "হাযা হুয়াল ইসলাম", "ফিকহুস সীরাহ" এবং "আল-লামাযহাবিয়্যাহ" গ্রন্থগুলো বিশ্বজুড়ে ইসলামি জ্ঞানচর্চায় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। তিনি শরিয়ত ও তরিকতের সমন্বয়ে ইসলামি আধ্যাত্মিকতার এক পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন। সুফি দর্শনকে আধুনিক যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অগ্রপথিক। ২০১৩ সালে দামেস্কে মসজিদে শাহাদাত বরণের মাধ্যমে তাঁর জীবনাবসান ঘটে — যা তাঁর জীবনদর্শনেরই এক অনন্য পরিণতি।
আব্দুল্লাহ যোবায়ের
আব্দুল্লাহ যোবায়ের তাসাউফ নিয়ে লেখালেখি করেন। এ পর্যন্ত তাঁর বেশ কিছু অনুবাদগ্রন্থ বের হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে ইমাম আবুল কাসিম কুশায়রি রচিত আর রিসালাতুল কুশায়রিয়্যা ও শায়খ আবু আব্দুর রহমান সুলামি রচিত নারী সূফীদের জীবনকথা উল্লেখযোগ্য। তিনি সওতুল মদীনা সম্পাদনার সাথে যুক্ত। বর্তমানে তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি আমেরিকার স্টোনি ব্রুক য়ুনিভার্সিটিতে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন।


