ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহু: সংক্ষিপ্ত জীবনী

ইমাম হুসাইন (রা.)
ইমাম হুসাইন ইবন আলি (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র। আহলুল বায়ত তথা নবি পরিবারের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। তাঁর উপনাম আবু আব্দুল্লাহ। তাঁর উপাধি সায়্যিদু শাবাবি আহলিল জান্নাহ (জান্নাতের যুবকদের সর্দার)। তিনি ইসলামের ইতিহাসের এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। বীরত্ব, আপসহীনতা, আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি, তাওয়াক্কুল এবং সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গের এক মহান প্রতীক তিনি।
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
ইমাম হুসাইন ইবন আলি (রা.) ১০ জানুয়ারি, ৬২৬ খ্রি. তথা ৪র্থ হিজরির শাবান মাসে মদিনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা জান্নাতের নারীদের সর্দার ফাতিমা (রা.)। তাঁর বাবা ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলি (রা.), তাঁর ভাই জান্নাতের যুবকদের একজন সর্দার, তাঁর নানা স্বয়ং হযরত মুহাম্মদ (সা.), তাঁর নানি শ্রেষ্ঠতম নারীদের অন্যতম হযরত খাদিজা (রা.), তাঁর দাদী হযরত ফাতিমা বিনত আসাদ (রা), যাকে মহানবি (স) নিজের মাতৃস্থানীয় মনে করতেন। তাঁর জন্মগ্রহণের পর মহানবি (সা.) নিজেই তাঁর কানে আযান দেন এবং আকীকা করে তাঁর নাম রাখেন হুসাইন।
মহানবি (সা.) হযরত হুসাইন (রা.) কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি বলেছেন,
الحسَنَ والحُسَيْنَ سيِّدا شبابِ أَهْلِ الجنَّةِ
‘হাসান ও হুসাইন জান্নাতের যুবকদের সর্দার।’ (তিরমিযি)
হুসাইন (রা.) কে মহানবি (সা.) প্রাণাধিক ভালোবাসতেন। তাঁকে নিজের সাথে মসজিদে নিয়ে যেতেন। কখনো কাঁধে বসাতেন। কোলে তুলে নিয়ে চুমু দিতেন। তিনি নামাযরত থাকলে কখনও কখনও হাসান ও হুসাইন (রা.) তাঁর পিঠে চড়ে বসতেন। কখনও হুসাইন (রা.) কাঁদলে তিনি ফাতিমা (রা.) কে বলতেন, ‘তুমি কি জানো না— ওর কান্নায় আমি কষ্ট পাই?’ (সিয়ারু আলামিন নুবালা)
তিনি আরও বলেছেন,
مَنْ أَحَبَّ الْحَسَنَ وَالْحُسَيْنَ فَقَدْ أَحَبَّنِي، وَمَنْ أَبْغَضَهُمَا فَقَدْ أَبْغَضَنِ
‘যে হাসান ও হুসাইনকে ভালোবাসলো, সে আমাকেই ভালোবাসলো। যে তাঁদেরকে ঘৃণা করলো, সে আমাকেই ঘৃণা করলো।’ (তারিখু বাগদাদ)
মহানবি (সা.) যখন পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, তখন হযরত হুসাইন (রা.) এর বয়স মাত্র সাত বছর। সেই বছরই তাঁর মা খাতুনে জান্নাত ফাতিমা (রা.) ও দুনিয়া থেকে বিদায় নেন।

চরিত্র-মাধুর্য
ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁর নানা মহানবি (সা.) এর যোগ্য উত্তরসুরী ছিলেন। শারীরিক এবং চারিত্রিক- উভয়দিকেই তিনি মহানবি (সা.) এর সাথে সাদৃশ্য রাখতেন।
তাঁর দানশীলতা ছিল প্রবাদপ্রতিম। তিনি এমনভাবে দান করতেন যে, গ্রহীতার জন্য আশাতীত হতো। একবার একজন ক্রীতদাসের পাশ দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন। সেই দাস তাঁকে শ্রদ্ধাভরে একটি ছাগল উপহার দিলো। তিনি বললেন, ‘তুমি কী স্বাধীন নাকি ক্রীতদাস?’ তখন হুসাইন (রা.) সেই ছাগলটির প্রকৃত মালিক দাসের মনিব হতে পারে ভেবে ছাগলটি ফিরিয়ে দিলেন। দাস এবার বললো, আমিই এটার আসল মালিক। তিনি তখন ছাগলটি গ্রহণ করলেন। এরপর মনিবের কাছ থেকে দাসকে কিনে মুক্ত করে দিলেন এবং ছাগলটি তাকে দান করলেন।
আরেকবার তিনি ঘরে বসে নামাজ পড়ছিলেন। একজন অপরিচিত বেদুঈন এসে তাঁর কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করলো। তিনি নামাজ সংক্ষিপ্ত করে বের হয়ে আসলেন। এরপর তাঁর হিসাবরক্ষককে ডেকে ঘরে যা আছে সব নিয়ে আসতে বললেন। মাত্র দুইশ দিরহাম সারা মাসের পারিবারিক খরচ নির্বাহের জন্য রাখা ছিল। ইমাম হুসাইন (রা.) পুরোটাই ঐ বেদুঈনকে দিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এটুকুই নাও। তোমার কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। তবে জানবে তোমার প্রতি আমার স্নেহ-ভালোবাসার কমতি নেই।’ বেদুঈন অভিভূত হয়ে ফিরে গেলো।
ইমাম হুসাইন (রা.) অত্যন্ত বিনয়ী ও ইবাদতগুযার ছিলেন। রাতের শেষাংষ অধিকাংশ সময় তিনি নামাজে কাটাতেন। ইবন উমর (রা.) বলেছেন, হুসাইন (রা.) ২৫ বার পায়ে হেঁটে হজ্জ করেছেন। তিনি কুরআনের হাফিজ এবং ইলমুত তাজবিদের একজন ইমাম ছিলেন। যখন তিনি তিলাওয়াত করতেন, অঝোর ধারায় কাঁদতেন।
তিনি জান্নাতুল বাকিতে শহিদদের কবর যিয়ারত করতেন। তাঁর হৃদয় সবসময় দুনিয়াবিমুখ ছিল। তিনি বেশি বেশি বলতেন, আল্লাহ আমাকে আখিরাতের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলুন, যাতে দুনিয়াবিরাগের মাধ্যমে আমি আখিরাতের সত্যতা হৃদয়ে অনুভব করতে পারি। আল্লাহ। আমাকে আখিরাতের বিষয়গুলোতে এমন দৃষ্টি দান করুন, যাতে আমি আগ্রহ নিয়ে সমস্ত ভালো কাজের অনসন্ধানী হই এবং ভীতি সহকারে গুনাহ থেকে বিরত থাকি।’

খিলাফত আমলে অবদান
ইমাম হুসাইন (রা.) অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ও সাহসী ছিলেন। তিনি তাঁর বাবা আলি হায়দার (রা.) এর সাথে উষ্ট্রের যুদ্ধ, সিফফিনের যুদ্ধ এবং নাহরাওয়ানের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। উষ্ট্রের যুদ্ধের দিন তিনি সেনাবাহিনীর ডান পাশের সেনাপতি ছিলেন। উসমান ইবন আফফান (রা.) এর খিলাফতের সময়ও তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। উসমান (রা.) কে বিদ্রোহীদের হাত থেকে রক্ষার জন্য তাঁর ঘরের দরজায় পাহারা দিয়েছেন। সর্বোপরি কারবালার ময়দানে তিনি অভূতপূর্ব বীরত্ব, ঈমানী দৃঢ়তা এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল- এর পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন।
হযরত আবু বকর, হযরত উমর, হযরত উসমান (রা.) প্রমুখ ইমাম হুসাইন (রা.) কে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। হযরত উসমান (রা.) এর নিরাপত্তায় হযরত আলি (রা.) তাঁদের দুভাইকে মোতায়েন করেছিলেন। হযরত হুসাইন (রা.) পরবর্তীতে পিতা হযরত আলী (রা.) এবং এরপর হযরত হাসান (রা.) এর হাতে বাইয়াত হয়েছিলেন। মুয়াবিয়া (রা.) এর সাথে হযরত হাসান (রা.) এর বাইয়াত হলে তাঁরা দুভাই মদিনায় চলে আসেন। কিন্তু মুয়াবিয়া (রা.) এর মৃত্যুর পর পাপিষ্ট ইয়াযিদ ক্ষমতার মসনদে বসে গেলে হযরত হুসাইন (রা.) অসাধারণ দৃঢ়তার পরিচয় দেন এবং ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ ইয়াযিদ নিতান্ত পাপিষ্ট ছিল। তার হাতে ইসলাম ধর্মের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রাখা অসম্ভব ছিল। সত্যের খাতিরেই ইমাম হুসাইন (রা.) তার হাতে বাইয়াত হলেন না; তাঁর জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেলো।

শাহাদত বরণ
হুসাইন (রা.) এর কাছে কুফাবাসীরা অসংখ্য চিঠি লিখলো— তিনি যেন কুফায় আসেন। কুফাবাসীরা তাঁর হাতে বাইয়াত হতে চায়। ইমাম হুসাইন (রা.) এর সামনে তখন দুটি পথ খোলা ছিল। তিনি ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত হয়ে তার বশ্যতা স্বীকার করে নিতে পারেন। তাতে তাঁর প্রাণরক্ষা ও অনেক পার্থিব উপকার হলেও দ্বীন ইসলামের প্রকৃত রূপ চিরতরে হারিয়ে যাবে। আর দ্বিতীয় পথ কুফাবাসীর আহ্বানে সাড়া দেয়া, যাতে অন্তত আবারও নববী আদর্শের খিলাফতের দিকে ফিরে যাবার স্বপ্ন রয়েছে। ইমাম হুসাইন (রা.) ইসলামের স্বার্থে শেষের পথটিই বেছে নিলেন।
তিনি যখন কুফায় যাচ্ছিলেন, পথিমধ্যে কারবালা প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে তাঁর কাফেলাকে আটকে দেয়া হয়, পানি থেকে বঞ্চিত করা হয়। তিনি যুদ্ধ করতে আসেননি। কিন্তু পাপিষ্ট ইয়াযিদের বাহিনী হয় বাইয়াত নয় যুদ্ধ— এছাড়া অন্য কোনো সুযোগ তাঁকে দেয়নি।
ইমাম হুসাইন (রা.) তখন অভূতপূর্ব বীরত্ব আর আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করেন। তিনি মাথা নত করলেন না। তিনি বললেন, ‘হে আমার জাতি! আমাকে মেরে ফেলা কি তোমাদের শোভা পায়? আমার রক্ত কি তোমাদের জন্য বৈধ? আমি কি তোমাদের নবির কন্যার পুত্র নই? আমি কি তাঁর চাচাতো ভাইয়ের পুত্র নই? ‘এই দুজন জান্নাতবাসী যুবকদের নেতা’— আমি আর আমার ভাইয়ের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এ বাণী কী তোমরা শোনোনি? আমার কথা বিশ্বাস করলে ভালো। নয়তো তোমরা জাবির ইবন আব্দুল্লাহ, আবু সাঈদ, যায়দ ইবন আরকাম— এঁদেরকে জিজ্ঞেস করো।’
কিন্তু পাষাণ হৃদয়ের এই বাহিনী তাঁর কথা শুনলো না। উমর ইবন সাদ সর্বপ্রথম হুসাইন (রা.) বাহিনীর উপর তীর ছুড়লো। তখন হুসাইন (রা.) এর ছেলে আলি আকবার যুদ্ধ করতে বের হলেন। তিনি শহিদ হয়ে গেলেন। হুসাইন (রা.) এর শিশপুত্র আলি আসগার তাঁর তাঁর কোলে ছিলেন। তিনিও এক লোকের ছোড়া তীরে শহিদ হলেন। হুসাইন (রা) পানি খাবার জন্য পানি আনতে বললেন। পানি নিয়ে আসা হলো। তিনি পানের ইচ্ছা করা মাত্রই হাসিন ইবন নুমায়র তীর ছুড়লো। সেই তীর তাঁর চোয়ালে বিদ্ধ হলো। তিনি সেই রক্ত অঞ্জলি ভরে হাতে নিলেন। এভাবে ইমাম হুসাইন (রা.) পরিবারের সবাইকেই শহিদ করা হলো। পুরুষদের মধ্যে কেবল তিনি একাই অবশিষ্ট ছিলেন। হুসাইন (রা.) হাজার হাজার শত্রুর মোকাবেলায় একা লড়াই করে যাচ্ছিলেন। শিমারসহ অশ্বারোহীর দল চারদিক থেকে তাঁকে আক্রমণ করছিলো। তিনি একাকী তরবারি চালাচ্ছিলেন। তাবারিসহ অন্যান্য ইতিহাসগ্রন্থে বলা হয়েছে, হিংস্র নেকড়ে আক্রমণে ভেড়ার পাল যেভাবে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, ঠিক সেভাবেই তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ছিলো। সবশেষে শিমার সবাইকে একযোগে আক্রমণে প্ররোচিত করে। অবশেষে ইয়াযিদের বাহিনী লোকেরা তাঁর কাঁধ, তাঁর কণ্ঠার হাড় এবং এরপর তাঁর বুকে বশার্ঘাত করলো। তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। তখন শিমর নেমে এসে হুসাইন (রা.) এর মাথা কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। কেউ কেউ বলেছেন, তাঁর মাথা বিচ্ছিন্ন করেছিল খাওলা বিন ইয়াযিদ। তাঁর শরীরে ৩৩ টি বশার্ঘাতের চিহ্ন দেখা গিয়েছিল। তাঁর কাপড়ে তীরের জন্যই ছিদ্র হয়েছিল ১১৯ টি। এমনকি তারা ইমাম হুসাইন (রা.) এর অস্ত্রশস্ত্র ও পরিধেয় বস্ত্রও নিয়ে নিয়েছিল। একদল লোক নিজেদের ঘোড়া নিয়ে এসে তাঁর শরীরকে পদদলিত করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়।
যুদ্ধ শেষ হবার পর কাফেলা যখন শহিদদের লাশের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলো, তখন যয়নব বিনত আলি চিৎকার করে বলে ওঠেন: “ও মুহাম্মদ! ও মুহাম্মদ! হুসাইন এই উন্মুক্ত প্রান্তরে ছিন্নভিন্ন রক্তস্নাত দেহে পড়ে আছে। ও মুহাম্মদ! আপনার কন্যারা আজ যুদ্ধবন্দী আর বংশধরেরা সবাই মৃত। তাঁদের উপর দিয়ে পূবালী বাতাস বয়ে চলেছে।”
হাসান বসরির কাছে হুসাইন (রা.) এর হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পৌঁছলে তিনি কেঁদেছিলেন। কান্নার তোড়ে তাঁর দুকাঁধ কাঁপছিল। তিনি বলছিলেন, ‘সেই উম্মতের জন্য লাঞ্ছনা! যে উম্মতের নবির সন্তানকে পিতৃপরিচয়হীন ব্যক্তি হত্যা করে।’
রাবি ইবন খাইসাম বললেন, ‘তারা সেই শিশুটিকে হত্যা করেছে, সফর থেকে ফিরলে রাসুলুল্লাহ (সা.) যাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরতেন।’
ইমাম হুসাইন (রা.) এর এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। তাঁর আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইসলামের প্রকৃত সত্য যেমন অবিকৃত থেকেছে, তেমনি যুগে যুগে যারা সত্যের জন্য লড়াই করেছে, তাদের জন্যও অনন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।

আব্দুল্লাহ যোবায়ের
আব্দুল্লাহ যোবায়ের
+ posts

আব্দুল্লাহ যোবায়ের তাসাউফ নিয়ে লেখালেখি করেন। এ পর্যন্ত তাঁর বেশ কিছু অনুবাদগ্রন্থ বের হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে ইমাম আবুল কাসিম ‍কুশায়রি রচিত আর রিসালাতুল কুশায়রিয়্যা ও শায়খ আবু আব্দুর রহমান সুলামি রচিত নারী সূফীদের জীবনকথা উল্লেখযোগ্য। তিনি সওতুল মদীনা সম্পাদনার সাথে যুক্ত। বর্তমানে তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি আমেরিকার স্টোনি ব্রুক য়ুনিভার্সিটিতে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top