
ইমাম আলী ইবনে হুসাইন এর উপাধি হলো হযরত যয়নুল আবেদীন। তিনি এ নামেই বেশি প্রসিদ্ধ। তিনি ছিলেন সাহলুল বায়েতের শিক্ষাপ্রকুর, রাসুলুল্লাহ সাল্লাহি আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরূদরা নাতি শহিদদের গর্ব হযরত হুসাইন ইবন আলী রা. এর পথম পুত্র।
তার অন্যান্য ভাই আবু বকর, আবদুল্লাহ এবং আলী আকবর কারবালায় পিতার সাথে শাহাদত বরণ করেন। যয়নুল আবেদীন রহ. ছিলেন খুবই অসুস্থ। এজন্য আল্লাহ তায়ালা তাকে যুদ্ধ থেকে নিরাপদে রাখেন। ইমাম যয়নুল আবেদীনের মায়েমই হযরত হুসাইন রা. এর বংশের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে এবং আধ্যাবিধ চলছে।
ইমাম আলী দানজান হযরত আলী রা. এর খোলাফতকালে ৩৮ হিজরীতে কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। পারস্যের সর্বেশ্বর বাদশাহ ইয়াজদেজর্ডের কন্যা শাহরবান ছিলেন তার জননী। তার প্রসঙ্গেই তার জননী মুসলিম ঘরে। সেখানে তিনি পরিবার-পরিজনের সাথে মদিনায় চলে আসেন। জ্ঞাতী যুক্তকদের নেতা বিখ্যাতির নাতি হাসান আলই পিতা হুসাইনের তত্ত্বাবধানে লালিত পালিত হন। সেখানেই পবিত্র কুরআনে মুখস্থসহ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখে পাণ্ডিত্য লাভ করেন।
রহানী জগতে তিনি ছিলেন একচ্ছত্র সম্রাট। এজন্য নাফে ইবনে জুবাইর তাকে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ পাক আমাকে ক্ষমা করুন।আপনি হচ্ছেন মুসলিম বিশ্বের সেরা এবং লৌকিক শিক্ষার্থী। সুতরাং আমি কেন যাদেব ইবনে আসলামের মতলিবের কাছে?’। তিনি বলেলেন, ‘ইলম যেখানেই পাওয়া যায় সেখানে উপস্থিত হয়ে ইলম হাসিল করা বাঞ্জনীয়।’
ইমাম যয়নুল আবেদীন রহ. আহলে বাইতের সদস্য হিসেবে সবার কাছে গভীরশ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র ছিলেন। বিশেষত ইলমে ফিকহেসমকালীন তাবেঈনদের মধ্যে তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছিলেন তিনি প্রিয় পিতা হযরত হুসাইন রা. এর শাহাদতের পর মদিনা পাকে ফিরে আসেন এবং এখানেই ছুয়িটাবে অবস্থান করেন। নবীর বংশধর এবং হযরত হুসাইন রা. এর একমাত্র সন্তান হিসেবে সকলের শ্রদ্ধা — ভক্তি ও মায়ামততার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
তার প্রতি মানুষের প্রেম এবং শ্রদ্ধাভক্তির বিশেষ নিম্নের ঘটনার দ্বারা অনুমান করা যায়।
একবার হিশাম ইবনে আবদুল মালেকের ভাতিজা সুলাইমান ইলোফেতের আমলে হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের ইচ্ছে করেন। ভিড়ের জন্য তার পক্ষে বার্থ হয়ে মিমার ছুড়াপ করে শামের লোকদের দিয়ে আলাদা বৈঠকী করে চুমু দেয়। ঠিক এ সময় হযরত যয়নুল আবেদীন হজ্বের আসওয়াদ চুমু দেওয়ার জন্য আসলেন সবাই পথম বিভি নিয়ে সরে গিয়ে থেকে করে দেয়। মামাবাসীরা আবাক হয়ে গেলো। তারা ফেশমরকে বললো, চমৎকার চেহারার এই মহান মানুষটি কে? হিশাম হিংসাবসত বললো, ‘আমি চিনি না।’ প্রসিদ্ধ আরবি কবি ফারাজদাক সেখানে ছিলেন। তিনি বললেন, তার পরিচয় আমি জানি। এরপর তিনি তাৎক্ষণিক এক কবিতা আবৃত্তি করলেন। সেটির ভাবার্থ ছিল, এই প্রশ্নটাই: যে মক্কা ও হাজরে আসওয়াদ আমার কাছে আলো করে চেয়েছো, তার পরিচয় উতার আমার কাছে আছে যদি কেউ তার সন্ধান করে। তিনি এমন একজন ব্যক্তি যে, মক্কার মাটি তার পাদের শব্দের সাথে পরিচিত এবং পবিত্র কাবা ও তার আশে পাশের ভূমিগুলো তার সাথে পরিচিত। তিনি আল্লাহর সব থেকে উত্তম বান্দার সন্তান পদরেখা, পদচুম্বন, পাক-পবিত্র,
সুপরিচিত ও বিখ্যাত। তিনি আহমাদ-এর সন্তান, যাকে আল্লাহ নবী হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। যার উপর আল্লাহ সবসময় দরূদ পাঠান। যদি এই কাবা ঘর জানতো যে, যে তাকে চুমু দিতে এসেছে তাহলে অশ্রুর হয়ে মাটিতে পড়ে যেত তার পায়ের ধূলার প্রায় চুমু দেওয়ার জন্য। এই মহান ব্যক্তির (আলী) এবং দিগের নবী তার পিতামহ, যার মেহেদীর নূরের দ্বারা উম্মত সর্বালোকিত হয়ে থাকে। তিনি নারীদের নেত্রী হযরত ফাতিমা ও দীনের নবী (সা.)-এর সুলতানিত্বলুন্ঠক সন্তান, তার তলোয়ার ছিল কাফের ও মুশরিকদের জন্য মৃত্যু পরোয়ানা। যখনই কুরাইশ বংশের কেউ তাকে দেখে তারা বীরাচারিক্ষে দেয় যে, সমস্ত অলৌকিক ক্ষমতার তার অলৌকিক ক্ষমতার কাছে হার মেনেছে এবং কথনো তার থেকে উল্লুক কাউকে কিছু করার ক্ষমতা নেই। তিনি তিনি মর্যাদা সম্পন্ন গৌরবের সাথে সম্পৃক্ত, সে হলাম তার এবং নারকের যে কারো পরিচালনায় অসম্ভব। তাকে হিশাম! তুমি যে ভান করেছো তুমি তাকে চেন না এবং তুমি জিজ্ঞাসা করছ (সে কে?)। তুমি তার কোন লোকমান হব না? কেননা তুমি যদিও তাকে অস্বীকার কর তথাপিও আর ও আনারকের সবাই তাকে চেনেন। লাজ্ব থেকে তার চোখকে সরিয়ে রাখলে এবং তিনি রাগ-শিলংশত্তকে আরামে চোখখুলি তা থেকে সরে থাকে। কেউ তার সাথে কথা বললে অনুমতি না দেন। তার কলামের নূরের ছটায় অন্ধকারের পর্দা ছিঁড়ে যায়। যেমনভাবে সূর্যের আলো অন্ধকারান্বিত সিরিয়ে দেয়। এমন তার দানদাতার যে কখনও কথা না বলে ‘না শব্দটি ব্যবহার করেননি। যদি এটা আল্লাহর এক অধিতীয়ার সাক্ষ্য দিতে হলে সাক্ষ্য দেন না হলে সেখানেও ‘না’ শব্দটি না বলে (হ্যা) শব্দটি বলতেন।’
তার শানে ফারাযদাকের এই অসাধারণ কবিতা যুগ যুগ ধরে পঠিত হয়ে আসছে।
ইমাম আলী ইবনে হুসাইন রা. আবু বকর রা., হযরত উমর রা., হযরত উসমান গনী রা. সহ সমস্ত সাহাবিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং ভালোবাসতেন। তিন খলীফাদের প্রতি আন্তরিক ভক্তি এবং সমর্থন ছিলো। তাই আহলে বাইতের প্রতি অনুগততা প্রকাশের ছলনায় কিতপয় ষাড়যন্ত্রীদের লোক তার সামুখে হযরত আবু বকর এবং হযরত ওমারের সামালোচনা করলে তিনি তাদের আমলের কাছে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্নের কথা ঘোষণা করেন।
তিনি দৈনিক এক হাজার রাকাআত নফল নামাজ আদায় করতেন। এ কারণেই বিশিষ্ট তাবেয়ী সাঈদ ইবনে মুসাইয়িবাহ তাকে যয়নুল আবেদীন হেতাবে ভূষিত করেন। এরপরও তিনি বলতেন, আমি আমাকে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত মনে করি না। তার ইবাদত বন্দেগী সুফি তারিকার উচ্চান শাজ্ঞায় তার পরিচয় নাম বিদামান।
ইবনে তাইমিয়ার সুত্রে সাঈদ ইবনে মুসাইয়িবাহ বলেন, ইবাদত, বিয়াজত, ভালোবাসা উদারতা এবং মধুর বিচার ও শিষ্টাচারিতার কারণে হযরত যয়নুল আবেদীন ইসলামের প্রশান্তি এবং সৌন্দর্য ও নিদর্শনের হিসেবে স্বীয় জ্যাতি অর্জন করেন। তিনি অতি সুস্পষ্টার আচার ব্যবহার করে উত্তম নামেতে পরিচিত হন। তিনি কখনও সমস্যা আর মুফিকা কোন অচ্ছেতেই রাত্রের নামাযের ব্যত্যয় করতেন না। অধিক পরিমাণে নামাজ়াত, যিকির আযকারের এবং সীমাহীন পথে তিনি টুকে তারা দিতে কষ্ট দিতেন না। তাওয়ারেফের সময় এবং পবিত্র ছানমুসহ তিনি অত্যন্ত একাগ্রচিতে বিনয়ের সাথে আল্লাহ পাকের দরবারে মুনাজাতে নিমগ্ন থাকতেন। আল্লাহ পাকের ধ্যান এবং একাগ্রতার সাথে সিজদাবায়ায় দীর্ঘ মুনাজাতে বাকুল হয়ে কান্নাকাটি করতেন। রাত সদ্দা রোযা পালন অত্যন্ত ছিলেন এবং দানশীলর রোযা পালন। অনেক সময় রমজান মাসে বকরী খাসী জবাই করে সমস্ত গোশত ফকির-মিসকিনদের মধ্যে বিতরণ করতেন আর যতন্ন বছর কেটে যেছ্ছে হাজ ইফতার করতেন। তিনি একবার হাজার উমরা এবং হজ্জেরত পালন করেন এবং পিতা হযরত
হুসাইন এবং চাচাজানের অনুকরণে এবং বাবার পথে হেঁছুত পদন্ত করেন।
হযরত যয়নুল আবেদীন ৯৪ জিলকারি মুহাররম মাসের দ্বিতীয় তারিখে আমানিকার ৫৮ বছর বয়সে পবিত্র মদিনায় ইন্তিকাল করেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদে মদিনায় কিয়ামত নেমে এসেছিলো। মদিনাবাসী শোকাভিভূত হয়ে সাত দিন পর্যন্ত বাজারের দোকানপাটই বন্ধ রাখল। তিনি টাকে ৩৪ জন সন্তান রেখে যান। তাদের মায়েদের মাঝে বিশেষ অগ্রাধি হযরত হুসাইন রা. এর বংশধর এবং সালাসল্লাহ সা. এর বংশধরে ছড়িয়ে আছেন।
তার গভীর তাৎপর্যবহ কয়েকটি বাণী নিম্নরূপ:
( ১ ) ইমাম যুহরী বলেন, যয়নুল আবেদীন দুআয় বলতেন, ‘হে আমার নফস ! তুমি এই জগতে আর কতদিন থাকতে ? তুনিয়ার অহায়ী বাসস্থানে আর কতকাল অবস্থান করবে ? তোমার পূর্বসূরীগণ সকলেই তো চির বিদায় গ্রহণ করেছেন। মাটি তাদের নিজের মধে গোপন করে ফেলেছে। তারা আজ যমীনের গভীরে অবুত হয়ে আছেন। তাদের অবচয়ন চিন্তা থেকে কেন শিক্ষা গ্রহণ কর না?’
( ২ ) হে বৎস ! ফাসেকদের সাহচর্য অবলম্বন কর না। ফাসেকদের সাহচর্য তোমাকে অতি তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করে দিবে, তোমাকে অপমান করবে। মিথ্যাচারের সাথী হয়ো না, কারণ সে মরীচিকাসদৃশ। সেটা দূরকে নিকট এবং নিকটকে দূরে করে দেখাবে। আহমকের সঙ্গী হয়ো না, কারণ সে মঙ্গল সাধন করতে গিয়ে অমঙ্গল করে। আত্মীয়তার বিচ্ছেদ ঘটায়, এমন লোককে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। কেননা এ ধরনের লোক পবিত্র কুরআনের বিধানে অভিশপ্ত। আল্লাহ বলেছেন, ‘ক্ষমতার অধিকারী হলে সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীর বুকে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।’
( ৩ ) হে মানব! পাপাচারের পর তাওবাকারীকে আল্লাহ পাক ভালোবাসেন। সৎ কাজের নির্দেশ দান এবং অসৎ কাজ থেকে প্রতিনিবৃত্তকরণ থেকে বিরত থাকা আল্লাহ পাকের কিতাব বর্জন করার শামিল।
( ৪ ) সুন্নাহ মুতাবিক আমল সর্বোত্তম আমল। সুন্নতের প্রতি অবহেলা বর্জন কর। কারো সাথে শত্রুতা পোষণ কর না, যদিও সে দর্ভিণ হয় এবং ক্ষতির আশংকা না থাকে। পর্থনীকার কোনদিন লাভবান হতে পারে না। হিংসুক অনুতাপে মৃত্যুবরণ করে।
( ৫ ) খারাপ বন্ধু সে, যে তোমাকে ইছলত লেখে খুব বলে এবং তোমার সাথে নেক কাজে সম্পর্ক ছিন্ন করে। তাকদীরের অমসৃণের সাথে সৃষ্টি সম্পর্ক স্থাপন ইয়াকীনের সর্বোচ্চ স্তর পরিচায়ক।
