
আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের জন্য যুগে যুগে সর্বস্তরের সুফিবৃন্দ যে বিষয়টি অবলম্বন করেছেন, সেটা হলো মানবসেবা। মানবসেবায় তাঁরা অনুসরণীয় আদর্শ রেখে গিয়েছেন। তাঁদের এমন আদর্শে মুগ্ধ হয়ে কোটি কোটি মানুষ মুসলমান হয়েছে। সর্বযুগের সাধকদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক শায়খ আব্দুল কাদির জিলানি র. এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাঁর সমগ্র জীবনে মানবসেবার অসংখ্য দৃষ্টান্তে পরিপূর্ণ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
لَّيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّواْ وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَـكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَالْمَلآئِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّآئِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُواْ وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاء والضَّرَّاء وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَـئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَـئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
‘পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফিরানোতে কোন পুণ্য নেই; কিন্তু পুণ্য আছে কেউ আল্লাহ্, পরকাল, ফিরিশতাগণ, সমস্ত কিতাব এবং নবীগণে ঈমান আনয়ন করলে আর আল্লাহ্প্রেমে আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, পর্যটক, সাহায্যপ্রার্থিগণকে এবং দাস-মুক্তির জন্যে অর্থ দান করলে, সালাত কায়েম করলে ও যাকাত প্রদান করলে আর প্রতিশ্রæতি দিয়ে তা পূর্ণ করলে, অর্থ-সংকটে দুঃখ-ক্লেশে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য ধারণ করলে। এরাই তারা যারা সত্যপরায়ণ আর এরাই মুত্তাকী।’ (সূরা বাকারা: ১৭৭)
একবার রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘ইসলামের কোন জিনিসটি সর্বোত্তম?’ তিনি বলেছিলেন,
تطعم الطعام وتقرئ السلام على من عرفت ومن لـم تعرف
‘অপরকে খাবার খাওয়ানো এবং চেনা-অচেনা সবাইকে সালাম দেয়া।’ (সহিহ আল বুখারি)
খাবার মানুষের প্রধানতম মৌলিক চাহিদা। বাগদাদে এসে শায়খ জিলানি র. নিজেও চরম দরিদ্রতা আর অর্থকষ্টের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাঁর কারও কাছে হাত পাতা বা কারও দান নেয়ার অভ্যাস ছিল না। এগুলো সমীচীনও মনে করতেন না। এজন্য বহু সময়ই তিনি আধপেট খেয়ে বা না খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন। গিবতাতুন নাযির গ্রন্থে ইবন হাজার আসকালানি র. তাঁর সূত্রে উল্লেখ করেছেন,
শায়খ বলেছেন, আমি খরনুবুশ শাওক (এক ধরনের গাছের ফল), ফেলে দেয়া সব্জি আর নদীতীরে ভেসে আসা বাঁধাকপি খেয়ে থাকতাম। দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির জন্য আমি খুবই কষ্টে পড়লাম। বাগদাদে তখন অবস্থা ছিল এমন। অগ্যতা না খেয়েই বেশ কিছুদিন কেটে গেল। ফেলে দেয়া খাবার খেয়ে আমি জীবনধারণ করতাম। তাই একদিন ক্ষুধার যন্ত্রণায় বাধ্য হয়ে নদীর তীরে গেলাম, যাতে বাধাঁকপির পাতা অথবা তেমন কিছু পাই। কিন্তু যেখানেই গেলাম, সেখানেই দেখলাম কেউ না কেউ আমার আগে পৌঁছে গেছে। খাবার কিছু পেলেই দেখা যেতো সেখানে আরও অনেক গরিব লোক আছে। তাদের সাথে এসব নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে আমার ভালো লাগলো না। তাই শূন্যহাতেই ফিরে আসলাম। এরপর এসে ঢুকলাম মসজিদে ইয়াসিনে। ক্ষুধায় অতিশয্যে আমি দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে বসে পড়লাম। সরে আসলাম মসজিদের এক পাশে। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মতো অবস্থা হলো আমার। হঠাৎ ঝলসানো মাংস আর রুটি নিয়ে এক ইরানদেশীয় যুবক মসজিদে ঢুকলেন। তিনি বসেই খেতে শুরু করলেন। তিনি একেকবার খাবার উঠাচ্ছিলেন আর আমার মুখও খুলে যাবার উপক্রম হচ্ছিল। নিজের উপরই আমি বিরক্ত হয়ে উঠলাম। নিজেকে বললাম, ‘আল্লাহর যা ফয়সালা, তাই হবে।’ এদিকে লোকটি আমাকে দেখে বললেন, ‘ভাই! বিসমিল্লাহ [বলে আমার সাথে অংশ নিন]।’ মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে আমি অসম্মতি জানালাম। তিনি তখন আল্লাহর কসম দিয়ে একই কথা বললেন। তার আহŸানে সাড়া দেয়ার জন্য মন তাগাদা দিল। অগ্যতা সামান্য খাবার মুখে তুললাম। তিনি এবার নানান প্রশ্ন করা শুরু করলেন- ‘আপনি কী করেন? আপনি কোত্থেকে এসেছেন? আপনার নাম কী?’ বললাম, ‘আমি এক ফিকহ-শিক্ষার্থী, আমার বাড়ি জিলান-এ।’ তিনি বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা। আমিও তো জিলান থেকে এসেছি। আপনি জিলানের আব্দুল কাদির জিলানি নামে কাউকে চেনেন? আবু আব্দুল্লাহ আস সাওমাঈ আয যাহিদের নাতি হিসেবে তিনি পরিচিত।’ আমি বললাম, ‘আমিই তো সে।’
আমার কথা শুনে তিনি হয়রান হয়ে গেলেন। তার চেহারা লাল হয়ে গেল। বললেন, ‘ভাই! আল্লাহর কসম! আমি বাগদাদে আপনার জন্য কিছু টাকা নিয়ে এসেছিলাম। সবাইকে আপনার কথা জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু কেউ বলতে পারেনি। একসময় আমার টাকাও ফুরিয়ে গেলো। পরপর তিনদিন আমি খাবারের জন্য কিছুই কিনতে পারিনি। আপনার টাকা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। অবশেষে চতুর্থ দিন নিজেকে বলেছি, ‘তিনদিন না খেয়ে কেটে গেলো। শরিয়তমতে এখন মৃত জন্তু খাওয়াও আমার জন্য জায়েজ। তাই আপনার জন্য গচ্ছিত টাকা থেকে এই রুটি আর মাংস কিনেছি। আপনি নিশ্চিতমনে খেতে পারেন। এগুলো তো আপনারই। বাহ্যিকভাবে আপনি আমার মেহমান আসলে আমিই আপনার মেহমান।’
আমি এবার এমন কথার ব্যাখ্যা জানতে চাইলাম। তিনি তিনি বললেন, ‘আপনার মা আমাকে আটটি দিনার দিয়েছিলেন আপনাকে দেবার জন্য। আল্লাহর কসম! আজকের আগে আমি আপনার সম্পদের খেয়ানত করিনি। এরপর আপনার সেই দিনারগুলো দিয়ে এই খাবার কিনেছিলাম। এই খেয়ানতের জন্য আপনার কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। ’
আমি তাকে শান্ত করলাম এবং বুঝিয়ে শুনিয়ে দিনারগুলো থেকে তাকে কয়েকটি মুদ্রা দিয়ে দিলাম। বললাম, ‘এগুলো আপনার রাহাখরচ।’ তিনি সেগুলো নিয়ে চলে গেলেন।
একই বইয়ের আরেকটি বর্ণনায় বুঝা যায়, আব্দুল কাদির জিলানি র. বাকি মুদ্রাগুলো দরিদ্র মানুষদের খাবার খাওয়ানোর পেছনে ব্যয় করেছিলেন। তিনি বলেছেন,
[তাসাউফ চর্চার] শুরুর দিকে একবার বাগদাদে একাধারে বিশ দিন কিছু না খেয়েই কেটে গেলো। হালাল কোনও কিছু পেলাম না। শেষপর্যন্ত হালাল কিছু পাবার উদ্দেশ্যে আমি কিসরার ভগ্ন প্রাসাদের দিকে রওয়ানা হলাম। কিন্তু সেখানে গিয়েও দেখা গেল সত্তুর জন নেককার মানুষ আমার মতো একই জিনিস খুঁজছেন। তখন নিজেকে বললাম, ‘খাবার নিয়ে এদের সাথে ধাক্কাধাক্কি করাটা কোনো পৌরুষের কাজ হবে না।’
অগ্যতা আমি আবারও বাগদাদে ফিরে আসলাম। সেখানে আমার দেশেরই একজন পরিচিত লোকের সাথে দেখা হয়ে গেলো। তিনি একটুকরো মূল্যবান ধাতু দিয়ে বললেন, ‘তোমাকে দেবার জন্য তোমার মা আমাকে এটা দিয়ে পাঠিয়েছেন।’
সেখান থেকে আমি কিছুটা নিজের জন্য রাখলাম। এরপর বাকিটুকু নিয়ে দ্রæত কিসরার সেই ভগ্ন প্রাসাদের কাছে ছুটে গেলাম এবং সেই সত্তুরজন ফকিরদের মাঝে বণ্ঠন করে দিলাম। তারা বললেন, ‘এগুলো কোত্থেকে আসলো?’ বললাম, ‘আমার মা এগুলো পাঠিয়েছেন। কিন্তু আপনাদের ফেলে রেখে একা একা আমি সবকিছু নিতে চাইনি।’
সেখান থেকে আবারও বাগদাদে ফিরে আসলাম এবং বাকী অংশ দিয়ে খাবার কিনে দরিদ্র মুসলিমদের সাথে নিয়ে একসাথে খেলাম। এভাবে সবটুকুই খরচ হয়ে গেল।
দেখা যাচ্ছে, নিজে অত্যন্ত অর্থকষ্টে আর ক্ষুধায় জর্জরিত থাকার পরও শায়খ জিলানি র. সর্বস্ব দরিদ্রদেরকে বিলিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করেননি। তিনি ছিলেন নি¤েœাক্ত আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন:
وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
‘এবং নিজেরা অভাবগ্রস্থ হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দান করে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।’ [ সুরা হাশর ৫৯:৯ ]
শায়খ জিলানি রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, ‘আমি সমস্ত আমল ঘেঁটে দেখেছি। কিন্তু অপরকে খাওয়ানোর চেয়ে উত্তম কোন আমল পাইনি। পুরো দুনিয়া যদি আমার হাতে চলে আসতো, তবুও ক্ষুধার্তদের খাওয়ানোর স্বার্থে আমি দুনিয়ার কিছুই জমিয়ে রাখতাম না।’
তিনি তাঁর ভৃত্য মুযাফফরকে রুটির খাঞ্চা নিয়ে আসতে বলতেন, যাতে কেউ রাতের খাবার চাইতে এলে দিতে পারেন। তিনি বলতেন, ‘আমার আকাক্সক্ষা আবারও যদি আমি আগের মতো মরুভূমি আর বিরান অঞ্চলে থাকতে পারতাম। তখন লোকেরা আমাকে দেখতো না, আমিও তাদের দেখতাম না। আসলে এখানে থাকার মাধ্যমে মানবজাতির কল্যাণ করাই আল্লাহর ইচ্ছা। আমার হাতে পাঁচশ’রও বেশি ইহুদি ও খ্রিস্টান তাওবা করেছে। ভবঘুরে, সন্ত্রাসীদের মধ্যে তাওবাকারীদের সংখ্যা এক লাখেরও বেশি। এটা এক বিরাট কল্যাণ।’
শায়খ আব্দুল কাদির জিলানি র. এর মতো আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে হলে তাঁর মতো আমল করার বিকল্প নেই। তিনি যেভাবে মানবসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন, আমরা যদি তার সামান্য কিছুও করতে পারি, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ করতে সক্ষম হবো। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দিন। আমিন।

