এখনো আশা করি সকলে আমার সাথে একমত হবেন, আমাদের ছোটবেলায় সুফি ছাব বলতে সহজ সরল, নম্র ভদ্র দ্বীনদার একজন মানুষকে বুঝানো হতো। সুফি ছাব বলতে যার মাঝে দুনিয়ার লোভ নেই, দ্বীনের ব্যাপারে যিনি সব থেকে সচেতন। আমরা বড় হয়েছি এই শ্রেণীর মানুষদেরকে দেখে দেখে। তাদের আখলাক দেখে বারবার আমরা অনুপ্রাণিত হতাম।
আমাদের ছোটবেলায় সুফী টাইপের মানুষদেরকে ভাল মন্দ সব ধরনের মানুষই কমবেশি সমীহ করত। আমার শ্বশুরের কাছে কিছু চাঁদাবাজ এসেছিল। তখন তিনি সিলেট শহরের একটি রেষ্টুরেন্টে নাস্তা করছিলেন। চাঁদাবাজদের বক্তব্য তিনি শুনলেন নীরবে। নাস্তা শেষ করতে করতে তিনি বললেন “আমরা মেছাব মানুষ, আমার একটি মাদ্রাসা আছে, সুযোগ পেলে সমাজের ভাল মানুষদের থেকে চাঁদা কালেকশন করি।“ দলনেতার হাঁক শুনা গেল “হেই চাচার নাস্তার বিলটা দিয়া আইও। অন্যবায় যাই”।
১৯৯৮ সালে আমেরিকা থেকে দেশে যাবো। নিউ ইয়র্কের জন. এফ. কেনেডি এয়ারপোর্ট। আমার বাচ্চারা সহ আরো কয়েকজনের সাথে আমার শ্বশুর জনাবও এসেছেন আমাকে বিদায় দিতে। প্যাসেঞ্জারের সাথে ভিজিটর ঢুকতে পারবেন না। গেইটে পুলিশ। তবে চেক ইন করার পর প্যাসেঞ্জারের সাথে ভিজিটর দেখা করতে পারবেন অন্য গেইট দিয়ে। আমার শ্বশুরের কথা হল, তিনি আমার সাথেই ঢুকবেন। অন্যরা বুঝাতে ব্যর্থ হলেন। সবাই বলাবলি করলেন ঠিক আছে যান, গেইট থেকে পুলিশ ফিরিয়ে দেবে তখন বুঝবেন। গেইটে পৌছলাম। আমার হাতে পাসúোর্ট ও টিকেট আছে, আমি ঢুকে গেলাম। পিছনে শ্বশুরজী, তাঁর হাতে কিছু নাই। পুলিশ প্রশ্ন করলো “আর ইউ প্যাসেঞ্জার?” শ্বশুরজী হাতের লাটি দিয়ে আমার লাগেজ দেখিয়ে রাগতঃস্বরে বললেন “হেল বেটা হেল”। মানে তিনি আমাকে হেল্প করবেন। পুলিশ আর কিছু বলল না, শ্বশুরজী মাথা উঁচু করে ঢুকে গেলেন। আমার সাথে আসা পেছনের লোকগুলোর তখন হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি দেয়ার উপক্রম।
আমাদের ছোটবেলায় এই ধরনের সহজ সরল মানুষদেরকেই আমরা সুফী বলে জানতাম।
আমার মেজ ভাই মাওলানা নাজমুল হুদা সাহেবকে উনার তীক্ষ্ণ স্মরণশক্তির কারণে সৎপুর আলীয়া মাদ্রাসায় সহপাঠীরা জিন্নে মুমিন মনে করতেন আবার আমার বড় ভাই শায়খুল হাদীস আল্লামা শামছুল হুদা সাহেবকে তবিয়তের কারণে সবাই সুফী সাহেব বলে ডাকতেন।
একসময় দেশে ও দেশের বাইরে কিছু মানুষের মুখে তাসাউফ ও সুফীদের বিকৃত সংজ্ঞা শুনতে শুরু করলাম। বেশ কিছু চটি বইও পড়া হল, বেশিরভাগই আরবি ভাষায়। আমার উস্তাজ শায়খ আব্দুস সালাম আল-বাসয়ূনির সাথে এই বিষয়ে বেশ কিছু আলাপ আলোচনাও হল। উনারা সবাই তাসাউফ আর সুফী বলতে যা বুঝান ছোটবেলা থেকে এই পর্যন্ত ঐ সব কিছুকে আমরা একবাক্যে ভন্ডামী বলেই জানি।
আমার একসময় এই বিষয়ে একটু গভীর গবেষণার খেয়াল হল। তাসাউফের মৌলিক কিছু কিতাবাদি পড়লাম। আমার দীর্ঘ গবেষণায় আমি যা বুঝতে পেরেছি, তাসাউফ হচ্ছে:
حُسْنُ المُعَامَلَةِ مَعَ الخَالِقِ وَ المَخْلُوْقِ
“খালিক এবং মাখলুক উভয়ের সাথে সুন্দর আচরণ”।
আল্লাহর সাথে আচরণ খারাপ করে কেউ যেমন সুফী হতে পারে না, ঠিক তেমনি মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয় অনাত্মীয় তথা সমাজের যে কোন মানুষ এমনকি আল্লাহর অন্য যে কোন মাখলুকের সাথে অসুন্দর আচরণ করেও কেউ সুফী হতে পারে না। প্রকৃত সুফীদের জীবন গবেষণায় এই সত্যটিই প্রকাশিত হয়। যে কারণে তাসাউফকে “ইহসান” বলা হয়। তাসাউফ হচ্ছে দয়াল নবীজীর আখলাক।
এই তাসাউফ আমাদের সমাজ থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তাসাউফের নামে বানোয়াট কিছু কিচ্ছা কাহিনী, অহেতুক চিৎকার, আর যথেচ্ছা তাকফির তাসাউফকে দিন দিন আরো বিকৃত রূপ দিচ্ছে। অপরাধ করে জেলে গেলে গাজী, চেয়ারকাঁপানো চিৎকার দিলে জেহাদী, পাইকারী তাকফীর করতে পারলে ইমামে আহলে সুন্নাত- এই হচ্ছে আখেরি জামানার তাসাউফ। নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আখলাকই যে তাসাউফ এই ওয়াজ আজ খুব একটা শোনা যায় না।
সত্যিকার তাসাউফ চর্চা যে একবারে নাই তা অবশ্য নয়। আমার দেখা সেরা সুফী সাধকদের মধ্যে আমার ওয়ালিদ মুহতারাম এবং মুরশিদুনা আল্লামা ফুলতলী রাহিমাহুমুল্লাহ অন্যতম।
ফুলতলী থেকে ঘুরে আসুন, বড় সাহেবকে কাছে থেকে দেখার চেষ্টা করুন। সত্যিকার তাসাউফ পেয়ে যাবেন। শুধু ফুলতলীই নয় আরো বহু জায়গা আছে, যেখানে গেলে, কাছে থেকে দেখলে আপনি নিশ্চিত তাসাউফ পাবেন ইনশাআল্লাহ। বদরপুর, জৈনপুর, হিজিম, উজান্ডি, ফুরফুরা, ছারছীনা, সোনাকান্দা, তিলিপ, মৌকরা, হাশেমিয়া, খাকবুনিয়া, ফান্দাউক, খানকায়ে ওয়াইসিয়া, সরাইল বাগে মদীনা, বিশকুট আমার দেখা কয়েকটি হক্ব দরবার। তবে মনে রাখবেন, যেখানে নবীর আখলাক নেই সেখানে তাসাউফ নেই। যেখানে বাড়াবাড়ি, যেখানে ছাড়াছাড়ি, সেখানে তাসাউফ নেই। তাসাউফ মুমিনের একটি হারানো সম্পদ। তাসাউফ নবীর আখলাকের নাম। তাসাউফ খালিক ও মাখলুকের সাথে সুন্দর ব্যবহারের নাম।

